কাইটসার্ফিংকে ঘুড়িসার্ফিংও বলা হয়। এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ঘুড়ি ব্যবহার করে একজন সওয়ারিকে একটি ছোট সার্ফবোর্ড বা ঘুড়ি-তক্তা (যা জাগরণ-তক্তার মতো) দিয়ে পানির উপর টেনে নেওয়া হয়।
জানো
[সম্পাদনা]কাইটসার্ফিং (অথবা ঘুড়িসার্ফিং) একেবারেই উইন্ডসার্ফিং, প্যারাগ্লাইডিং বা প্যারাসেইলিংয়ের মতো নয় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কার্যক্রম। কাইটসার্ফিং-এ বাতাসের শক্তি দিয়ে চালিত ঘুড়ি সওয়ারিকে পানির উপর দিয়ে টেনে নিয়ে যায় অথবা মাঝে মাঝে পানির উপর থেকে তুলেও নেয়। ঘুড়িটি বোর্ডের সাথে যুক্ত নয় বরং সওয়ারির কোমরে বাঁধা একটি বেল্টের সাথে আর তার পা বোর্ডে ফিট করা থাকে। সওয়ারির সীমিত পরিমাণে ঘুড়ি ও বোর্ড আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে।
উইন্ডসার্ফিং-এ বোর্ডের সাথে একটি পাল যুক্ত থাকে। এটি কখনোই সওয়ারিকে পানির উপর থেকে তুলতে পারে না। এখানে ঘুড়ির সাথে সওয়ারিকে বাঁধার কোনো দড়িও থাকে নাহ।
প্যারাগ্লাইডিং-এ কাইটসার্ফিংয়ের ঘুড়ির মতো কিছু ব্যবহার হলেও এখানে পানি বা বোর্ড যুক্ত থাকে নাহ। সাধারণত প্যারাগ্লাইডাররা পাহাড়চূড়া থেকে ঝাঁপ দিয়ে বাতাসের প্রবাহকে ব্যবহার করে উপরে ভেসে থাকে। লাতিন আমেরিকার দেশে একে বলা হয় প্যারাপেন্তে।
প্যারাসেইলিং হলো সমুদ্রতীরবর্তী অবকাশকেন্দ্রগুলোতে জনপ্রিয় কার্যক্রম। এতে একটি প্যারাশুট (যা অনেকটা ঘুড়ির মতো) শক্তিশালী নৌকার পেছনে বাঁধা থাকে। যা যাত্রীকে উপরে তুলতে সাহায্য করে। যতক্ষণ নৌকা চলে ততক্ষণ বাতাসে ঝুলে থাকে। নৌকা থেমে গেলে যাত্রী পানিতে (অথবা তীরে) নেমে আসে।
শিখো
[সম্পাদনা]
কাইটসার্ফিং শেখার সবচেয়ে দ্রুত ও নিরাপদ উপায় হলো একজন প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষকের কাছ থেকে শেখা। কিছু প্রশিক্ষক স্বাধীনভাবে কাজ করেন তবে বেশিরভাগই কাইটসার্ফিং বিদ্যালয়ে কাজ করেন।
সঠিক নির্দেশনা পেলে বেশিরভাগ মানুষ প্রায় তিন দিনের প্রশিক্ষণেই মৌলিক কৌশল আয়ত্ত করে স্বাধীনভাবে কাইটসার্ফিং করতে সক্ষম হন। যদিও কারও শেখার সময় কম লাগে আর কারও বেশি লাগে।
যে কেউ কাইটসার্ফিং শিখতে চাইলে আলাদা কোনো শর্ত নেই। শুধু মৌলিক শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন। এটি এমন একটি খেলা যা প্রায় সবার জন্য উন্মুক্ত। খেলাটির জন্য বিশেষ কোনো শারীরিক শক্তির প্রয়োজন নেই এবং ছয় বছর বয়সী শিশুরাও কাইটসার্ফিং শিখতে পারে।
তুষার তক্তা চালানো, রাস্তার তক্তা চালানো বা জাগরণ তক্তা চালানোর অভিজ্ঞতা থাকলে শেখার গতি কিছুটা বাড়তে পারে। তবে আসল দক্ষতা হলো শক্তিশালী ঘুড়ি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। যা বেশিরভাগ মানুষকেই একেবারে শুরু থেকে শিখতে হয়।
আন্তর্জাতিক কাইটবোর্ডিং সংস্থা (আইকেও) হলো কাইটসার্ফিং প্রশিক্ষকদের প্রধান সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। যদিও আরও কিছু সনদ প্রদানকারী সংস্থা রয়েছে, যেমন ব্রিটিশ কাইট খেলা সমিতি (বিকেএসএ) এবং আন্দালুসিয়ার পাল সমিতি (এফএভি)।
গন্তব্য
[সম্পাদনা]কেপ টাউনে অক্টোবর থেকে মার্চ/এপ্রিল পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব দিকের বাতাস প্রবাহিত হয়। কেপ টাউন থেকে প্রায় ৯০ মিনিট উত্তরে লাঙ্গেবান কাইটসার্ফিং শেখার জন্য দারুণ জায়গা। শার্ক বেতে হ্রদ উষ্ণ ও অগভীর। এখানে হাঙ্গরগুলো ক্ষতিকর নয়। প্রায় গুলোই বালুর হাঙ্গর। ঢেউতে চালানোর জন্য কেপ টাউনের উত্তরে ১৫ মিনিট দূরের ব্লাউবার্গ বা ডলফিন সৈকতে যাওয়া যেতে পারে।
মরিশাসে কাইটসার্ফিংয়ের সেরা সময় জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। দ্বীপের দক্ষিণ অংশে লে মর্ন নতুনদের জন্য ও অভিজ্ঞ সওয়ারিদের জন্য সেরা কাইটসার্ফিং সুযোগ দেয়।
এশিয়ায় অসংখ্য কাইটসার্ফিং স্থান রয়েছে। এর মধ্যে পরিচিত কয়েকটি হলো বরাকাই, হুয়া হিন, মুই নে, শিয়ামেন, হাইনান, বালি (কুটা সৈকত), শ্রীলঙ্কা (কালপিটিয়া)।

ইউরোপ জুড়ে এখন কাইটসার্ফিং বহুলভাবে অনুশীলন করা হয়। এখানে অনেক জনপ্রিয় গন্তব্য আছে যেখানে বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময় ভালো পরিবেশ পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য ইউরোপীয় কাইটসার্ফিং গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
স্পেনের তারিফা ইউরোপের সবচেয়ে বিখ্যাত কাইটসার্ফিং গন্তব্য। জিব্রালটার ও মরক্কোর রিফ পর্বতমালার মাঝের সংকীর্ণ অংশের ভেন্টুরি প্রভাবের এখানে অনন্য আবহাওয়া তৈরি হয়। যা বাতাসের গতি অনেক বাড়িয়ে দেয়। ফলে তারিফাতে আশেপাশের স্থানগুলোর তুলনায় অনেক বেশি বাতাস প্রবাহিত হয়।
তারিফার সৈকত ১১ কিলোমিটার জুড়ে সাদা বালুর সমুদ্রতীর দেখা যায়। এখানকার পানিতে কোনো ঝুঁকি থাকে নাহ। সৈকতের পেছনের বালিয়াড়ি ও পাহাড় থেকে সৃষ্ট তাপীয় বাতাসের কারণে ভ্যালদেভ্যাকেরোসের মতো স্থানেও কাইটসার্ফিং সম্ভব হয়। এমনকি বাতাস যথেষ্ট জোরালো নাহলেও কাইটসার্ফিং করা যায়।
তারিফার দক্ষিণ অবস্থান ও সমুদ্রঘেঁষা আবহাওয়ার কারণে, গ্রীষ্মেও আবহাওয়া স্পেনের অন্যান্য স্থানের তুলনায় কিছুটা ঠান্ডা এবং শীতে উষ্ণতর হয়। এর মানে এখানে সারা বছর কাইটসার্ফিং করা সম্ভব। জুলাই ও আগস্ট মাসে উচ্চ মৌসুমে প্লায়া দে লস লানসেস সৈকতে প্রায় ২০০০ এরও বেশি ঘুড়ি দেখা যায়।
ফুয়ের্তেভেন্তুরা, লানজারোতে ও তেনেরিফে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দ্বীপগুলোতে শক্তিশালী ও স্থায়ী সমুদ্রের বাতাস পাওয়া যায়। দক্ষিণ অবস্থান ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এগুলো কাইটসার্ফিং ক্যাম্পের জন্য জনপ্রিয় স্থান।
- উইসান্ত
উইসান্ত হলো কালে, ফ্রান্সের কাছে একটি নির্দিষ্ট কাইটসার্ফিং সৈকত। এখানে ২ কিলোমিটার দীর্ঘ অগভীর ঝুঁকিমুক্ত বালুকাময় সৈকত রয়েছে। ইংলিশ চ্যানেল (লা মানশ) থেকে প্রবাহিত দক্ষিণ-পশ্চিমে বাতাস ক্রস কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রায়ই আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়।
- ক্যাম্বার বালুকা
ক্যাম্বার বালুকা রোমনি মার্শের মধ্যে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ব্যস্ত কাইটসার্ফিং গন্তব্য। লন্ডন থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত ২ মাইল অগভীর বালুকাময় সৈকত। প্রধান বাতাস ক্রস অনশোর হলেও এখানে কিছু ঝুঁকি আছে। যেমন বাঁধ, জাহাজডুবি ও জোয়ারের পরিবর্তন হয়ে থাকে। তাই স্বাধীনভাবে কাইটসার্ফিং করার আগে স্থানীয়দের সঙ্গে পরামর্শ করা বুদ্ধিমানের কাজ। যদি বাতাস অফশোর হয় তবে মাত্র ৬ মাইল দূরের গ্রেটস্টোন সৈকত সাধারণত উপযুক্ত হয়। এই দুটি স্থানে উত্তর-পূর্ব বাদে সব দিকের বাতাসেই কাইটসার্ফিং করা সম্ভব।
ক্যারিবীয় অঞ্চলে কাইটসার্ফিংয়ের জন্য সেরা স্থানগুলো রয়েছে। ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের কাবারেতে এবং মেক্সিকোর এল কুইয়ো বিশ্ববিখ্যাত গন্তব্য।
ব্রাজিলের উত্তর উপকূলে শক্তিশালী ও স্থায়ী ব্যবসায়িক বাতাস প্রবাহিত হয়। এখন এখানে কাইটসার্ফিংও খুব জনপ্রিয়। ভেনেজুয়েলার ইসলা মার্গারিতার প্লায়া এল ইয়াকে-ও কাইটসার্ফিংয়ের জন্য বিখ্যাত। জনপ্রিয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে কুম্বুকো ও জেরিকোকোয়ারা। আরও দক্ষিণে ব্রাজিলের অন্যান্য ভালো স্থান হলো কাবো ফ্রিও, বুজিওস ও ফ্লোরিয়ানোপোলিস।
কুইন্সল্যান্ডের নুসা বিশ্বের অন্যতম সেরা কাইটসার্ফিং গন্তব্য। গ্রীষ্ম জুড়ে নিশ্চিতভাবে প্রতিদিনই শক্তিশালী উত্তর দিকের বাতাস প্রবাহিত হয়। আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করো নুসা কাইটসার্ফিং [অকার্যকর বহিঃসংযোগ]। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরেও গ্রীষ্মে স্থায়ী দক্ষিণ-পশ্চিম বাতাস পাওয়া যায়। ভালো স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে উডম্যান পয়েন্ট, সেফটি বে (দক্ষিণে) ও ল্যান্সেলিন (পার্থ থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তরে)।
{{#assessment:প্রসঙ্গ|রূপরেখা}}