বিষয়বস্তুতে চলুন

উইকিভ্রমণ থেকে

জরথুস্ত্রী ধর্ম একটি প্রাচীন ইরানি ধর্ম, যার ইতিহাস ৩৫০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এবং যা আজও টিকে আছে।

জানুন

[সম্পাদনা]

জরথুস্ত্রবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জরথুস্ত্র (যিনি জরাথুস্ত্র নামেও পরিচিত), যদিও ধর্মটির বহু প্রথার শিকড় কয়েক শতাব্দী আগের। জরথুস্ত্র কোন সময়ে বসবাস করেছিলেন সে বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে একমত নেই। অনুমান অনুযায়ী তা খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত হতে পারে। ধারণা করা হয় জরথুস্ত্র প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় ধর্মের বহু বিদ্যমান প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করে এই ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৬৫০ সাল থেকে খ্রিষ্টীয় ৬০০ সাল পর্যন্ত জরথুস্ত্রবাদ ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের প্রধান ধর্ম এবং এটি পশ্চিমে আব্রাহামীয় ধর্মসমূহকে ও পূর্বে ধর্মীয় দর্শনগুলিকে প্রভাবিত করেছিল। মুসলিমদের দ্বারা পারস্য বিজয়ের পূর্বে এটি ছিল বহু প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম। খ্রিষ্টীয় ৬৫১ সালে ইসলামি বিজয়ের পর জরথুস্ত্রবাদ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। আজ জরথুস্ত্রবাদ ইরানে সরকারি স্বীকৃত সংখ্যালঘু ধর্মগুলির একটি এবং ইরানের আইনসভায় একটি আসন জরথুস্ত্রীদের জন্য সংরক্ষিত।

সাসানীয় সাম্রাজ্য ইসলামি বিজয়ের মুখে পতনের সময় কিছু পারসিকরা তাং রাজবংশের চীনে পালিয়ে যায় এবং সেখানে ধর্মটি প্রতিষ্ঠা করে। তখন এটি নেস্তোরীয় খ্রিস্টধর্ম ও মানিকীয় ধর্মের সাথে "তিন বিদেশি ধর্ম"-এর একটি ছিল। তবে তাং রাজবংশ পতনের পর ধর্মটি ক্ষয় পেতে শুরু করে এবং সঙ রাজবংশ পতনের পর চীন থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়।

বর্তমানে জরথুস্ত্রীদের দুটি প্রধান সম্প্রদায় রয়েছে: পারসিরা, যারা সপ্তম শতকে ইরানে সংখ্যালঘু হয়ে নিপীড়নের শিকার হলে গুজরাটে পালিয়ে আশ্রয় নেয় এবং ইরানি জরথুস্ত্রীরা, যারা ইরান ও মধ্য এশিয়ায় থেকে গেছেন কিন্তু এখনও বৈষম্য ও নিপীড়নের মুখোমুখি হন। পারসি সম্প্রদায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ইরানি জরথুস্ত্রীদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের প্রথায় বড় ধরনের পার্থক্য গড়ে উঠেছে। উনবিংশ ও বিংশ শতকে যে ইরানি জরথুস্ত্রী ভারত গিয়েছিলেন তাদের বংশধররা ইরানি নামে পরিচিত এবং তারা আইনগতভাবে পারসিদের থেকে আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃত। ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলে বহু পারসি সফল ব্যবসায়ী হন। পারসিরা ভারতের কিছু বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান যেমন টাটা, গোদিয়া ও ওয়াদরেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যা আজও ভারতের অর্থনীতিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। বহু পারসি সিঙ্গাপুরহংকংসহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে বসতি গড়েছিলেন। যেখানে তারা ছোট হলেও প্রভাবশালী সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত হন। আধুনিক কালে বহু জরথুস্ত্রী পশ্চিমা দেশে অভিবাসন করেছেন। পশ্চিমা জগতে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত জরথুস্ত্রী ছিলেন গায়ক ফ্রেডি মারকুরি। যিনি জাঞ্জিবারে জন্মানো এক পারসি পরিবারে জন্মেছিলেন এবং পরে ব্রিটিশ সঙ্গীতদল কুইনের গায়ক হন।

জরথুস্ত্রীদের উপাসনালয়কে বলা হয় অগ্নিমন্দির, যেখানে একটি চিরন্তন অগ্নিশিখা পবিত্র স্থানে প্রজ্বলিত রাখা হয়। সাধারণ ধারণার বিপরীতে, জরথুস্ত্রীরা অগ্নিকে উপাসনা করেন না। বরং তারা অগ্নিকে স্রষ্টার প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দেখেন এবং প্রার্থনার সময় অগ্নিশিখার দিকে মুখ করে থাকেন।

জরথুস্ত্রীদের পবিত্র গ্রন্থের নাম অবেস্তা

শহর ও অন্যান্য স্থানসমূহ

[সম্পাদনা]
  • 1 জিসিউ. এখানে আছে শিয়ানশেনলো, চীনে একমাত্র টিকে থাকা জরথুস্ত্রী স্থাপনা। তাং ও সঙ সাম্রাজ্যের সময় চীন ছিল পারস্য বংশদ্ভূত এক ক্ষুদ্র জরথুস্ত্রী সম্প্রদায়ের নিবাস। তবে মিং সাম্রাজ্যের সময় তাদের বিলুপ্তি ঘটে। উক্ত স্থাপনাটি জরথুস্ত্রী ধর্ম স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়ার পর দাও ধর্মীয় মন্দিরে রূপান্তরিত হয়।
ইসফাহানে আগুনের মন্দির
  • 2 ইসফাহান. প্রাচীন রাজধানীর পার্বত্য প্রান্তে একটি আতাশগাহ (অগ্নিমন্দির) থেকে শহরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়।
  • 3 কারাজ. এখানে প্রধান আকর্ষণগুলোর একটি হলো তখ্‌ত-ই রুস্তম, যা পাথরে নির্মিত পার্থিয়ান যুগের অগ্নিমন্দির।
  • 4 কেমান. এই শহরে স্থানীয় জরথুস্ত্রীদের প্রতি উৎসর্গীকৃত একটি জাদুঘর রয়েছে।
  • 5 পার্সেপোলিস.
  • 6 রেই. এখানে একটি 'নীরবতার মিনার' আছে। যেখানে মৃতদেহ ফেলে রাখা হতো যাতে তারা পবিত্র মাটি ও আগুনকে অপবিত্র না করে—এটি জরথুস্ত্রী বিশ্বাসের অংশ।
  • 8 ইয়াদ. ইরানের বাকি অংশ ইসলাম গ্রহণ করলেও ইয়াজদ তুলনামূলকভাবে জরথুস্ত্রীদের দুর্গরূপে টিকে আছে। এখানে ৫ থেকে ১০% মানুষ জরথুস্ত্রী। ইয়াজদের অগ্নিমন্দিরে বিশ্বাস করা হয় পঞ্চম শতাব্দী থেকে অগ্নি নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বলছে। শহরের নিকটবর্তী পাহাড়ে ছয়টি পবিত্র তীর্থস্থান আছে যেখানে ইরানি জরথুস্ত্রীরা বার্ষিক যাত্রায় যান। এর মধ্যে চাক চাক গ্রামের পির-ই-সাবজ সবচেয়ে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত।
মানচিত্র
জরাথুস্ট্রবাদের মানচিত্র
  • 9 মুম্বই. ব্রিটিশ শাসনামলে বহু পারসি এই মহানগরে চলে আসেন। তারা অভিজাত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা শ্রেণির অংশ হয়ে ওঠেন। ভারতের সবচেয়ে ধনী পারসি পরিবারগুলো, যেমন টাটা ও ওয়াদিয়া পরিবার, মুম্বাই-ভিত্তিক। শহরে প্রচুর পারসি ক্যাফেও আছে। এগুলো তাদের খাদ্যসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করে।
  • 10 সঞ্জন. এটি ভারতে পারসি শরণার্থীদের প্রথম আগমনস্থল। সেজন্য এখানে ভারতের প্রাচীনতম জরথুস্ত্রী বসতি। পারসিরা এই শহরের নাম রাখেন সঞ্জন। তাদের তুর্কমেনিস্তানের সঞ্জন শহরের নামানুসারে, যা তৎকালীন বৃহত্তর খোরাসানে (বর্তমানে মারি প্রদেশ, তুর্কমেনিস্তান) অবস্থিত ছিল।
  • 11 উদওয়াদা. উদওয়াদার আতাশ বেহরাম (অগ্নিমন্দির) ভারতের সবচেয়ে পবিত্র। এই বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবহৃত অগ্নিমন্দির। এটি সারা বিশ্বের জরথুস্ত্রীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।
  • 12 পাঞ্জাকেন্ত. স্থানীয় জাদুঘরে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। যখন এই অঞ্চল ছিল জরথুস্ত্রী ধর্মের প্রধান কেন্দ্র।

আজারবাইজান নাম এসেছে আত্রোপাটেনে থেকে, যা প্রাচীন পারসিক শব্দের গ্রিক অনুবাদ—অর্থ "পবিত্র অগ্নির দেশ"। তাই এই দেশে জরথুস্ত্রী ধর্মের সাথে সম্পর্কিত বহু স্থান রয়েছে।

  • 13 বাকু. আজারবাইজানের রাজধানীর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বাকু আতেশগাহ (অগ্নিমন্দির)। দুর্গসদৃশ এই স্থাপনাটি পারসিক ও ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে গঠিত। এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জরথুস্ত্রী, হিন্দু ও শিখ তীর্থস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
  • 14 খিনালুগ. আজারবাইজানের অধিকাংশ মানুষ তুর্কি হলেও এই দুর্গম পাহাড়ি গ্রামের মানুষ তাদের সাথে সম্পর্কিত নয়। একসময় এটি ককেশাসে জরথুস্ত্রী ধর্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল। তবে স্থানীয়রা দ্বাদশ শতকে ইসলাম গ্রহণ করলেও এখন তারা ধর্মভীরু মুসলিম। যদিও গ্রাম ও আশেপাশের এলাকা জরথুস্ত্রী নিদর্শনে সমৃদ্ধ।
  • এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পারসি সম্প্রদায়ের প্রধান কার্যালয়। এখানে আছে একটি ছোট জাদুঘর যা সিঙ্গাপুরের পারসি সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও জরথুস্ত্রী ধর্মীয় ঐতিহ্য প্রদর্শন করে। প্রবেশ নিখরচায় হলেও আগে থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পারসি জরথুস্ত্রী সমিতি (পিজেএএস)-এর সাথে যোগাযোগ করে সময় নির্ধারণ করতে হয়[অকার্যকর বহিঃসংযোগ]। এখানে একটি প্রার্থনাকক্ষও রয়েছে যেখানে প্রায় ৩০০ জনের স্থানীয় পারসি সম্প্রদায় সম্মিলিত প্রার্থনার জন্য সমবেত হন। কারণ সিঙ্গাপুরে কোনো অগ্নিমন্দির নেই।
  • 15 ব্রুকউড কবরস্থান, সারে। ইউরোপের একমাত্র জরথুস্ত্রী কবরস্থান ব্রিটেনের বৃহত্তম নেক্রোপলিসের (সমাধি নগরী) কেন্দ্রে অবস্থিত। এখানে এই ধর্মের অন্তর্ভুক্ত উল্লেখযোগ্য ব্রিটিশ পরিবারগুলোর সমাধি রয়েছে।

আলোচনা

[সম্পাদনা]

জরথুস্ত্রী ধর্মগ্রন্থ আভেস্তা লেখা হয়েছে আভেস্তীয় ভাষায়। যা প্রাচীন পারসি ও সংস্কৃতের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি দূরবর্তীভাবে লাতিন ও প্রাচীন গ্রিকের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

সম্মান

[সম্পাদনা]

পারসি অগ্নিমন্দিরে অ-পরসিদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে ইরানি জরথুস্ত্রী অগ্নিমন্দিরে সাধারণত অ-জরথুস্ত্রী প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু চিরন্তন অগ্নিশিখার পবিত্র অংশে প্রবেশ করতে পারে না।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]
  • পারস্য সাম্রাজ্য
  • ইয়াজিদি ধর্মকুর্দি জনগোষ্ঠীর একটি সংখ্যালঘু বিশ্বাস ব্যবস্থা। যার শিকড় জরথুস্ত্রী ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসলামের আগমনের পর এটি সংখ্যালঘু ধর্মে পরিণত হয়। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের লালিশ শহরে ইয়াজিদিদের সবচেয়ে পবিত্র মন্দির রয়েছে।
  • খ্রিস্টধর্ম আগমনের আগে আর্মেনিয়রা মূলত জরথুস্ত্রী ধর্ম পালন করত। বিশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত আনাতোলিয়ায় কিছু আর্মেনিয় সম্প্রদায়ে এই বিশ্বাস টিকে ছিল। আধুনিক যুগে এর প্রভাব দেখা যায় আর্মেনীয় নব্যপৌত্তলিক ধর্মে (স্থানীয়ভাবে “হেতানিজম”), যেখানে গার্নি মন্দিরে নিয়মিত পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
  • ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা
  • বাহাই ধর্ম
This TYPE জরাথুস্ট্রবাদ has রূপরেখা অবস্থা TEXT1 TEXT2

{{#assessment:প্রসঙ্গ|রূপরেখা}}

বিষয়শ্রেণী তৈরি করুন