পানীয় জলের সাথে বিভ্রান্ত হবেন না। পানীয় জলের বিষয়টি "পানি" নিবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
পর্যটকস্থলে প্রায়ই দেখা যায় ভ্রমণপিপাসুরা সমুদ্র বা ঝর্ণার জলের ধারে বসে নানা রকম আনন্দ করে ভ্রমণ উপভোগ করছেন। যে কোনো জলাধারকে হালকাভাবে নেওয়া কখনই ঠিক নয়, বিশেষ করে যদি সঙ্গে ছোট ছোট বাচ্চারা থাকে। জল সুরক্ষার বিষয়টি ভ্রমণপিপাসুদের সব সময় মনে রাখা উচিত। যদিও জল সুরক্ষার বিষয়টি এলাকার উপর নির্ভর করে। সমুদ্র সৈকতের ধারে সাঁতার কাটা এবং অন্যান্য কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত নানা রকম বিপদের আশঙ্কা থাকতে পারে। অনেক সময় জোয়ার, জলের স্রোত, বন্যপ্রাণী এবং সমুদ্রতলের বৈশিষ্ট্যগুলির স্পষ্ট ধারনা ভ্রমণপিপাসুদের থাকে না। এর থেকে বিপদের আশঙ্কা থেকে যায়। তাই আপনার সর্বদা ছোট বাচ্চাদের উপর নজর রাখা উচিত। সংগঠিত সমুদ্র সৈকতের বাইরে যদি কোনো সমুদ্র সৈকতে যান, তাহলে আপনার স্থানীয়দের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সম্ভাব্য বিপদের ঝুঁকি
[সম্পাদনা]

- অনেক সময় সমুদ্রে খরস্রোত জোয়ার থাকে। এর ফলে নিকটবর্তী তীরভূমি হতে সমুদ্র অভিমুখে জলের প্রবল প্রবাহ তৈরি হয়। জলের গতি একজন সাঁতারুর গতির তুলনায় অধিক গতিসম্পন্ন হয়। এর ফলে স্থির আবহাওয়াতেও সমুদ্রতট থেকে সমুদ্র অভিমুখে একজন সাঁতারুকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। খরস্রোত জোয়ার হলো সমুদ্র এবং হ্রদের স্নানের সময় লোকদের জন্য বিপদের একটি উৎস। আবার নদীর ক্ষেত্রে তলদেশ খাড়া হওয়ার কারণে জলের গতি ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়, ফলে জলের প্রবাহ দ্রুত ও উত্তাল হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিও সম্ভাব্য বিপদের ঝুঁকি বাড়ায়।
- পরিবর্তনশীল ভূ-প্রকৃতি অনেক সময় বিপদের কারণ হয়ে ওঠে। পরিবর্তনশীল ভূ-প্রকৃতির কারণে জলের নীচের ভূমি হঠাৎ করে উঁচু থেকে নিচু স্তরে বা সমতল থেকে খাড়া ঢালে রূপান্তরিত হয়। এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য বিপদের ঝুঁকি থাকে।
- জলের মধ্যে মাছ ধরার জাল, ডুবে থাকা গাছ এবং অবাঞ্ছিত বস্তু আপনাকে আটকে ফেলতে পারে। সেদিকে নজর রাখতে হবে।
- সমুদ্র সৈকত বা নদীতটের চোরাবালি অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। চোরাবালি হলো বিশেষ এক ধরনের বালি বা পলি যা জলের সাথে মিশে এমন একটি অবস্থা তৈরি করে যে আপাতদৃষ্টিতে এটি কঠিন বা স্বাভাবিক মনে হলেও, এর উপর চাপ পড়লে বা নড়াচড়া করলে এটি হঠাৎ তরল হয়ে যায় এবং যেকোনো কিছুকে গ্রাস করতে পারে। তাই চোরাবালি থেকে দূরে থাকতে হবে।
- জেলিফিশ, হাঙর এবং অন্যান্য বিপজ্জনক বন্যপ্রাণী থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
- সুনামি এবং তীব্র আবহাওয়া সমুদ্র সৈকতের মানুষদের জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক হতে পারে। সুনামি এবং তীব্র আবহাওয়ার কারণে সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠে। ঢেউ অনেক উঁচুতে ওঠে। অন্য সময়ের স্বাভাবিক ঢেউের থেকে এই সময়ে তৈরি হওয়া ঢেউ আকারে দ্বিগুণ হয়ে বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করে।
- জলের ধারে অনেক সময় বড় গর্ত এবং খাড়া ঢাল থাকে। এগুলি পিচ্ছিল হতে পারে। এমনকি যদি পিচ্ছিল নাও হয়, একটি শিশু সহজেই ভারসাম্য হারিয়ে গভীর জলে পড়ে যেতে পারে। বিশেয় করে আপনি যদি ভিড় বা কোলাহলের মধ্যে থাকে থাকেন।
দলের প্রতি লক্ষ্য রাখুন
[সম্পাদনা]ভ্রমণপিপাসুরা অনেক সময় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ভ্রমণ করেন। দলগত ভাবে ভ্রমণ করলে একজন অন্যজনের উপর লক্ষ্য রখতে পারেন। এতে জল সুরক্ষা বাড়ে। মনে রাখবেন, ক্লান্তির কারণে অথবা হার্ট অ্যাটাক হলে বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বেশি জল শরীরে প্রবেশ করলে কেউ ডুবে যেতে পারেন। সেই সময় তার চিৎকার করার কোনও সুযোগ থাকে না। সেক্ষেত্রে তার প্রতি লক্ষ্য রেখে দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অন্তত শিশুদের দিকে নজর রাখুন। জোড়ায় সাঁতার কাটা জল সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি ভালো উপায়। এক্ষেত্রে কেউ না কেউ সর্বদা অন্যের উপর নজর রাখে।
অনেক সমুদ্রসৈকতে লাইফগার্ডেরা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করেন। লাইফগার্ড হলেন একজন প্রশিক্ষিত পেশাদার ব্যক্তি যিনি সুইমিং পুল, সৈকত, ওয়াটার পার্ক প্রভৃতি স্থানে লোকেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধার কাজ চালান। তবুও আপনাকে আপনার দলের প্রতি লক্ষ্য রাখা দরকার। লাইফগার্ডদের কর্তব্য হলো আপনি যখন তাদের কাছে সাহয্য চাইবেন তখনই তারা এসে সাহায্য করেন। তারা সৈকতে আসা মানুষদের উপর নজর রাখেন এবং কোনো বিপদের সম্ভাবনা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেন। তবে অনেক সময় লাইফগার্ডেরা প্রর্যাপ্ত সংখ্যায় থাকেন না। তাই জল সুরক্ষার ব্যাপারে আপনাকেও দলের প্রতি লক্ষ্য রেখে সতর্ক থাকতে হবে।
ভাসমান সরঞ্জাম
[সম্পাদনা]
কিছু ভাসমান সরঞ্জাম বা যন্ত্রের উপর সতর্কীকরণ বার্তা থাকে যেগুলি কেবল কোনো অভিজ্ঞ মানুষের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করা উচিত অন্যথায় বিপদ ডেকে আনতে পারে। যেমন সাঁতারের টিউব অনেক সময় উল্টে গিয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে অথবা সাঁতারের টিউব একটি শিশুকে গভীর জলের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সেখানে শিশুটির সাঁতারের টিউব থেকে পিছলে পড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। এই সব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ মানুষের তত্ত্বাবধানে এগুলি ব্যবহার করা উচিত। মনে রাখাতে হবে সঠিক লাইফ জ্যাকেট এবং লাইফবয়গুলি ভিন্নভাবে তৈরি করা হয়।
খরস্রোত জোয়ার বা উজানিতটীয় স্রোত
[সম্পাদনা]

খরস্রোত জোয়ার বা উজানিতটীয় স্রোত হলো সমুদ্র সৈকত থেকে ভেঙে আসা ঢেউ থেকে সমুদ্র অভিমুখে তৈরি হওয়া জলের প্রবল প্রবাহ। দুটি পরস্পরমুখী স্রোত, ষেমন অভিতটীয় ও প্রতিতটীয় স্রোত পরস্পরের মুখোমুখি হলে যে আলোড়ন ঘটে তার ফল উজানিতটীয় স্রোত বা খরস্রোত জোয়ার তৈরি হয়। অনেক সময় জলের নিচের ভূপ্রকৃতির কারণে কয়েকটি গভীর অংশে জলের প্রবাহ প্রবলভাবে কেন্দ্রীভূত হয়ে গভীর জলে দ্রুত স্রোত তৈরি করে। খরস্রোত জোয়ারের সময় বেশিরভাগ মানুষের সমুদ্রে স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে ক্লান্তির কারণে মৃত্যু ঘটে। এই পরিস্থিতিতে তটের সমান্তরালে সাঁতার কাটুন অর্থাৎ স্রোতের লম্বভাবে সাঁতার কাটলে বিপদ এড়ানো যায়। অসুবিধা হলে সাহায্যের জন্য ডাকুন। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরে খরস্রোত জোয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে। মনে রাখবেন স্রোত থেকে বেরিয়ে আসার সাথে সাথে সাঁতার কাটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কঠিন নয়। তাই এমন কোনো জায়গা লক্ষ্য করার চেষ্টা করুন যেখানে আপনি পুনরায় এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়বেন না।
নদীর খরস্রোত থেকেও ভ্রমণপিপাসুদের সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। নদীর গতিপথে উল্লম্বভাবে কোমল ও কঠিন শিলা অবস্থান করলে নদীপ্রবাহে কঠিন শিলার তুলনায় কোমল শিলা বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে খাতের সৃষ্টি করে। এভাবে সৃষ্ট খাতের ওপর দিয়ে নদীর জল ধাপে ধাপে নেমে এসে খরস্রোতের সৃষ্টি করে। খরস্রোতা নদীতে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। খরস্রোতা নদীর প্রবল জলস্রোত এবং পাথরের কারণে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। নদীর ধারে ছবি তোলার সময় অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। নদীর পাড় থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের ও সঙ্গীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় সতর্কতা অনুসরণ করুন।
উদ্ধারকার্য
[সম্পাদনা]প্রথম কাজ হলো নিজেকে রক্ষা করা। অপরকে উদ্ধার করার দক্ষতা এবং জলের উপর খুব আত্মবিশ্বাসী না হলে আপনার কখনও জলে নেমে উদ্ধারকার্য করা উচিত নয়। দক্ষতা ছাড়া জলে নামলে আপনি অন্য কাউকে উদ্ধার না করেই নিজেই দূর্ঘটনার কবলে পড়তে পারেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় সম্ভাব্য সরঞ্জামগুলির (লাইফবয়, দাঁড়, খুঁটি, সার্ফবোর্ড ইত্যাদি) সন্ধান করুন। যতটা সম্ভব জল থেকে ডুবন্ত মানুষটিকে উদ্ধার করার জন্য সেগুলি ব্যবহার করুন। মনে রাখবেন, ডুবে যাওয়ার ভয়ে ভীত ব্যক্তি আপনাকে গভীর জলে টেনে নিয়ে যেতে পারে।
জলে কেউ নিখোঁজ হয়ে গেলে অন্যকে সাহায্যের জন্য ডাকার সময় নিখোঁজের জায়গাটি নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করুন। অন্যের সাহায্য নিন। নিশ্চিত করুন যে, কেউ সাহায্যের জন্য অবশ্যই উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে ফোন করেছেন (১১২, ৯১১ বা অনুরূপ)।
কেউ জলে ডুবে গেলে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে মাথা ঠান্ডা রাখুন। আশপাশের মানুষের সাহায্য চান এবং ডুবন্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব জল থেকে তুলে নিয়ে আসুন। জল থেকে ডুবন্ত ব্যক্তিকে তোলার পরই তাঁকে সোজা করে শুইয়ে দিয়ে খেয়াল করতে হবে যে তিনি শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছেন কি না। জল থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি সচেতন থাকা সত্ত্বেও প্রায়শই দেখা যায় যে তার চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘক্ষণধরে জলে থাকার কারণে তার শরীরের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে। তাই তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য ওই ব্যক্তিকে জল থেকে তুলে কাপড়চোপড় দিয়ে ভালো করে ঢেকে রাখা উচিত। যদি শ্বাসপ্রশ্বাস না থাকে বা শ্বাস নেওয়া কষ্টকর হয়, তাহলে লক্ষ করতে হবে যে শ্বাসনালির কোথাও কিছু আটকে আছে কি না। এ জন্য আঙুল দিয়ে মুখের মধ্যে কাদা–মাটি বা কোনো অপদ্রব্য থাকলে তা বের করে দিতে হবে। এরপরও শ্বাস না নিলে মাথা টানটান করে ধরে মুখ হা করাতে হবে। যদি উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে পড়ে এবং শ্বাস বন্ধ করে দেয়, তাহলে প্রায়শই মুখ দিয়ে পুনরুত্থানের মাধ্যমে তাকে বাঁচানো যেতে পারে। তার ফুসফুসে যে জল ঢুকেছে তাতে ভয় পাবেন না, কেবল মুখ দিয়ে পুনরুত্থানের প্রক্রিয়া চালিয়ে যান। একে মুখ থেকে মুখ পুনরুজ্জীবিতকরণ প্রক্রিয়াও বলে। এটি কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা বা উদ্দীপনা প্রদানের একটি প্রক্রিয়া যেখানে একজন উদ্ধারকারী আক্রান্ত ব্যক্তির মুখের উপর তার মুখ চাপিয়ে দিয়ে ব্যক্তির ফুসফুসে বাতাসের ফুঁ দেন। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, সাধারণত তাদের শ্বাসনালী উন্মুক্ত করার জন্য তাদের মাথা সামান্য পিছনের দিকে বাঁকানো প্রয়োজন হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো একই গতিতে এবং একই পরিমাণে বাতাস দিন। যদি আপনি জানেন তাহলে বাতাসের প্রথম অংশের পরে সম্পূর্ণ কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) শুরু করুন। অন্য কেউ দায়িত্ব নেওয়ার আগে থামবেন না। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুস ও শ্বাসনালি থেকে জল বের করার জন্য খুব বেশি সময় না নেওয়াই শ্রেয়। প্রাথমিক চিকিৎসা চলার পাশাপাশি রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে।
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]{{#assessment:প্রসঙ্গ|রূপরেখা}}