বিষয়বস্তুতে চলুন

উইকিভ্রমণ থেকে
ভ্রমণ প্রসঙ্গ > সাংস্কৃতিক আকর্ষণ > জাপানের সংখ্যালঘু সংস্কৃতি

জাপান সাধারণভাবে বিশ্বের অন্যতম জাতিগতভাবে একজাতি ভিত্তিক দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে মোট জনসংখ্যার ৯৬ শতাংশেরও বেশি মানুষ নিজেদের ইয়ামাতো (অর্থাৎ জাতিগত জাপানি) হিসেবে পরিচয় দেন। তা সত্ত্বেও, এই দেশে বেশ কয়েকটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বসবাস করে। আদিবাসীদের মধ্যে রয়েছেন হোক্কাইডোর আইনু জনগণ এবং ওকিনাওয়া ও দক্ষিণের দ্বীপগুলোর রিউকিউ জনগণ। এ ছাড়াও, দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত অভিবাসী সম্প্রদায়ও রয়েছে, যেমন জাইনিচি কোরিয়ান ও চীনা জনগোষ্ঠী, যাদের অনেকেই বহু প্রজন্ম ধরে জাপানে বসবাস করে আসছেন।

জানুন

[সম্পাদনা]
আরও দেখুন: জাপানি ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য

১৮৬৮ সালের মেইজি পুনর্স্থাপনের পর জাপান পশ্চিমা ঔপনিবেশিক মডেল অনুসরণ করে সম্প্রসারণ শুরু করে। প্রথম পদক্ষেপ ছিল ১৮৬৯ সালে এজো দ্বীপ দখল, যার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় হোক্কাইডো। এর আগে এজোকে বিদেশি ভূমি হিসেবে ধরা হতো; এটি কোনো রাষ্ট্রের অংশ ছিল না এবং প্রধানত আদিবাসী আইনু জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল। দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে কিছু জাপানি বসতি থাকলেও, মেইজি সরকারের বসতি স্থাপন নীতির কারণে হোক্কাইডোতে দ্রুত ব্যাপক জাপানি জনবসতি গড়ে ওঠে। এর ফলে আইনুরা জমি হারায়, জোরপূর্বক আত্মীকরণের মুখে পড়ে এবং জাপানি সরকারের বৈষম্যের শিকার হয়।

১৮৭৯ সালে রিউকিউ রাজ্য দখল করে সেটিকে ওকিনাওয়া প্রিফেকচার ঘোষণা করা হয়। এর আগে এটি স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং চীনা সাম্রাজ্যের করদ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল। দখলের পর স্থানীয় রিউকিউয়ান সংস্কৃতি কঠোরভাবে দমন করা হয় এবং জনগণকে মূলধারার জাপানি সমাজে মিশে যেতে বাধ্য করা হয়।

১৮৯৫ সালে প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধে জয়ের পর জাপান তাইওয়ান দখল করে এবং চীনকে বাধ্য করে তার করদ রাষ্ট্র কোরিয়ার ওপর প্রভাব ত্যাগ করতে। পরবর্তীতে ১৯১০ সালে কোরিয়াকে পুরোপুরি দখল করে নেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর তাকে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ছাড়তে হয়। তাইওয়ান ফেরত যায় চীনের কাছে এবং কোরিয়া ফিরে পায় স্বাধীনতা। অন্যদিকে ওকিনাওয়া আমেরিকান দখলে চলে যায় এবং ১৯৭২ সালে জাপানের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ঔপনিবেশিক আমলে শ্রমিক হিসেবে জাপানে আনা কোরিয়ানদের অধিকাংশ নিজ দেশে ফিরে গেলেও, একটি উল্লেখযোগ্য অংশ থেকে যায়। আজ তাদের জাইনিচি কোরিয়ান বলা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাপান সরকার ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক আত্মীকরণের নীতি শিথিল করে। এর ফলে জাতিগত সংখ্যালঘু সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটে, যা মূলত পর্যটনকেন্দ্রিক ছিল।

আইনু (আইনু মিনজোকু) জাপানের একমাত্র সরকারিভাবে স্বীকৃত জাতিগত সংখ্যালঘু। তারা হোক্কাইডো, হোনশুর উত্তর প্রান্ত, কুরিল দ্বীপপুঞ্জ, সাখালিন এবং রাশিয়ার কামচাটকার দক্ষিণ প্রান্তে আদিবাসী হিসেবে বসবাস করত।

আইনুদের ঐতিহ্যবাহী গ্রামভিত্তিক জীবনযাপনের এক বাস্তব আকারের মডেল

জাপান ও রাশিয়ার সরকার তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য চালিয়েছে এবং কঠোর আত্মীকরণ নীতি প্রয়োগ করেছে। আজ রাশিয়ায় আইনু ভাষা বিলুপ্ত, আর জাপানে এটি প্রায় মৃতপ্রায়, কেবলমাত্র হাতে গোনা কয়েকজন প্রবীণ মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। রাশিয়ায় আইনু সংস্কৃতি কার্যত বিলুপ্ত হলেও, জাপান সরকার ২১শ শতকে আইনু সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।

আইনু এবং উত্তর আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম উপকূলের জনগোষ্ঠীই ইতিহাসে একমাত্র সংস্কৃতি, যারা কৃষির আগে জটিল শিল্পকলা গড়ে তুলেছিল। সম্ভবত সালমন মাছের প্রাচুর্য্যপূর্ণ খাদ্য সরবরাহই এর মূল কারণ ছিল।

হোক্কাইডোতে বহু পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে পর্যটকেরা আইনু সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা পেতে পারেন।

  • 1 উপোপোই (উপোপোই), শিরাওই জাপানের প্রধান আইনু সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে রয়েছে জাতীয় আইনু জাদুঘর, একটি থিয়েটার যেখানে পর্যটকেরা ঐতিহ্যবাহী আইনু পরিবেশনা দেখতে পারেন, এবং কোতান নামে একটি ঐতিহ্যবাহী আইনু গ্রামের বাস্তব আকারের মডেল। (Q76283211)
  • 2 নিবুতানি আইনু সংস্কৃতি জাদুঘর (নিবুতানি আইনু বুনকা হাকুবুতসুকান), বিরাতোরি একটি জাদুঘর যেখানে বহু ঐতিহ্যবাহী আইনু নিদর্শন প্রদর্শিত হয়, এবং যা বেশ কয়েকটি আইনু গ্রামের এলাকায় অবস্থিত। (Q11371926)
  • 3 আকান-কো আইনু কোতান হ্রদ (আকান-কো আইনু কোতান), আকান জাতীয় উদ্যান লেক আকানের তীরে একটি আইনু গ্রাম, যেখানে অসংখ্য দোকানে ঐতিহ্যবাহী আইনু হস্তশিল্প পাওয়া যায়।
  • 4 শিরানুকা (শিরানুকা-চো)। শিরানুকা শহর একটি ইওর , অর্থাৎ নির্ধারিত আইনু ঐতিহ্যবাহী জীবিকাঞ্চল। এখানে আইনু সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। উরেশিপা চিসে (আইনু সাংস্কৃতিক কার্যক্রম কেন্দ্র) একটি ছোট আইনু নিদর্শন প্রদর্শনী ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে (যেমন নাচ, রান্না) অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়। শহরটি তিনটি আইনু উৎসব সংরক্ষণের জন্যও পরিচিত—ইচারুপা উৎসব (আত্মাদের শান্ত করতে ও গ্রামের নিরাপত্তার জন্য নিবেদন), তিমি উৎসব (প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো), এবং শিশামো উৎসব (মাছ ধরার প্রাচুর্যের জন্য প্রার্থনা)। শহরের আশেপাশে এসব উৎসবসংক্রান্ত অনেক কিংবদন্তি রয়েছে। এছাড়া শিরানুকা বহিরাগত আইনুদের আক্রমণের স্থান ছিল এবং এখানে কিছু চাশি (আইনু দুর্গ ও ধর্মীয় স্থান) রয়েছে।
  • 5 নেমুরো উপদ্বীপ চাশি, নেমুরো আইনুরা ১৬শ থেকে ১৮শ শতকে হোক্কাইডো দ্বীপজুড়ে ৫০০টিরও বেশি চাশি (দুর্গ/কেল্লা) নির্মাণ করেছিলেন। নেমুরো উপদ্বীপের মধ্যে ৩০টি রয়েছে, যা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে ২৪টি জাপানের জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে স্বীকৃত এবং জাপানের শীর্ষ ১০০ দুর্গের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে। চাশিগুলো সাধারণত সাগরের ধারে পাহাড়ি ক্লিফে নির্মিত, অধিকাংশই আধা-বৃত্তাকার তবে কিছু আয়তাকার। বাইরে থেকে কেবল কাদা দেয়াল ও একটি খাল দিয়ে আলাদা করা হত। এগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। কেউ মনে করেন এগুলো ধর্মীয় কাজের জন্য তৈরি হয়েছিল এবং প্রয়োজনে দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হত। আবার কেউ মনে করেন এগুলো বিশেষভাবে জাপানিদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে অনেক সাইট চিহ্নহীন বা জনসাধারণের জন্য অপ্রবেশযোগ্য, তবে কয়েকটি যেমন ওননেমোতো চাশি ও নোৎসুকামাফু চাশি চিহ্নিত হয়েছে এবং কিছু পরিকল্পনা করলে ঘোরা যায়। কোনো কাঠামো আর অবশিষ্ট নেই, তবে ভালোভাবে সংরক্ষিত কয়েকটিতে এখনও বিন্যাস ও কাঠামোর ছাপ দেখা যায়। উইকিপিডিয়ায় Nemuro Peninsula Chashi Sites

রিউকিউয়ান

[সম্পাদনা]

রিউকিউয়ানরা হলো রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যা বর্তমানে ওকিনাওয়া প্রিফেকচার নামে পরিচিত। তারা ১৮৭৯ সালে জাপানের দ্বারা দখল হওয়ার আগে একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল। যেহেতু রিউকিউ রাজ্য চীনের করদ রাজ্য ছিল, তাই মূল ভূখণ্ডের জাপানি সংস্কৃতির তুলনায় রিউকিউয়ান সংস্কৃতিতে চীনা প্রভাব অনেক বেশি।

শুরি প্রাসাদ, রিউকিউ রাজ্যের রাজাদের প্রাক্তন আবাসস্থল

রিউকিউয়ানরা জাপানি ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও স্বতন্ত্র রিউকিউয়ান শাখার নানা ভাষায় কথা বলত। কয়েক দশকের বৈষম্য ও জাপানি সরকারের জোরপূর্বক সাংস্কৃতিক একীভবনের কারণে এই ভাষাগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়; কেবলমাত্র কিছু তরুণ তাদের দাদা-দাদী বা নানা-নানীর কাছ থেকে বড় হলে এই ভাষাগুলো বলতে পারে।

আইনুদের মতো নয়, রিউকিউয়ানরা জাপানি সরকারের কাছে সরকারিভাবে কোনো জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃত নয়। বরং তাদের ইয়ামাতো জনগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে, অনেক রিউকিউয়ান এখনও তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং নিজেদের মূল ভূখণ্ডের ইয়ামাতো জনগণের থেকে ভিন্ন মনে করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আমেরিকান বোমাবর্ষণে রিউকিউ রাজ্যের বহু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যায়, যদিও ২০শ শতাব্দীর শেষ থেকে কিছু পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। ২০শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে জাপানি সরকার ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক একীভবনের নীতি শিথিল করলে রিউকিউয়ান সংস্কৃতির পুনরুত্থান ঘটে, এবং আজ পর্যটকদের জন্য এই সংস্কৃতির স্বাদ নেওয়ার নানা সুযোগ রয়েছে।

  • 6 শুরি প্রাসাদ (শুরি-জো), নাহা রিউকিউ রাজ্যের প্রধান রাজপ্রাসাদ, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আমেরিকান বোমায় ধ্বংস হয়। ঐতিহাসিক নথি ও আলোকচিত্রের ভিত্তিতে ১৯৯২ সালে পুনর্নির্মাণ শুরু হয়, তবে ২০১৯ সালে অগ্নিকাণ্ডে পুনর্নির্মিত প্রধান হল আবার ধ্বংস হয়ে যায়। পুনর্নির্মাণ ২০২৬ সালের আগে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। (Q907052)
  • 7 রিউকিউ মুরা (রিউকিউ মুরা), ওন্না, ওকিনাওয়া দ্বীপ রিউকিউয়ান সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে তোলা একটি ছোট থিম পার্ক, যেখানে নানা সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী ও দর্শনার্থীদের জন্য কর্মশালার আয়োজন করা হয়। (Q25112734)
  • 8 তাকেতোমি দ্বীপ (竹富島), ইয়েয়ামা দ্বীপপুঞ্জ ইশিগাকির কাছাকাছি একটি ছোট দ্বীপ, যা ঐতিহ্যবাহী রিউকিউয়ান গ্রামের সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। (Q474560)

কারাতের উৎপত্তি মূলত ওকিনাওয়াতেই।

আরও দেখুন: বিদেশি চীনা রান্না
ইয়োকোহামা চায়নাটাউনের প্রবেশদ্বার

চীন ও জাপানের মধ্যে যোগাযোগের ইতিহাস এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। জাপানের ঐতিহ্যবাহী সব সংস্কৃতিতে চীনা প্রভাব স্পষ্ট। বছরের পর বছর চীনে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বহু চীনা শরণার্থী হিসেবে জাপানে পালিয়ে আসে, আবার কেউ কেউ ব্যবসায়ী হিসেবে আসে। মিং রাজবংশপন্থী কক্সিঙ্গা, যিনি ডাচদের পরাজিত করে তাইওয়ানে একটি ক্ষুদ্র মিং সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি আসলে জাপানে জন্মগ্রহণ করেন এক চীনা পিতা ও জাপানি মাতার ঘরে।

এডো যুগে, যখন টোকুগাওয়া শোগুনত কঠোর বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি চালু করে, তখন সামান্য ব্যতিক্রম হিসেবে ডাচ ও চীনা ব্যবসায়ীদের অনুমতি দেওয়া হয় নাগাসাকিতে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের, যদিও তাদের চলাফেরা কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ ছিল। নাগাসাকিতে দীর্ঘ চীনা উপস্থিতির কারণে শহরের স্থানীয় রান্নায় বিশেষভাবে চীনা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, এবং শহরটি বহু চীনা মন্দিরের জন্যও পরিচিত।

মেইজি ও তাইশো যুগে, যখন জাপান প্রথম অ-পশ্চিমা দেশ হিসেবে শিল্পায়িত হয়, তখন বহু চীনা শিক্ষালাভের জন্য জাপানে আসে। কারণ জাপান সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিকভাবে চীনের কাছাকাছি ছিল এবং পশ্চিমা দেশের তুলনায় অনেক সস্তা ছিল। চীনের প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট সান ইয়াত-সেনও জাপানে পড়াশোনা করেছিলেন। এছাড়া জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে (১৮৯৫-১৯৪৫) বহু তাইওয়ানিজ, আদিবাসী ও হান চীনা উভয়কেই, জোরপূর্বক শ্রমিক হিসেবে জাপানে আনা হয়েছিল।

আধুনিক কালে জাপানে তিনটি প্রধান চায়নাটাউন রয়েছে, যদিও দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও চীনা বাসিন্দারা ছড়িয়ে রয়েছে। আধুনিক চীনা জনসংখ্যার মধ্যে আছেন সাম্প্রতিক চীন থেকে আসা অভিবাসীরা এবং বহু প্রজন্ম ধরে জাপানে বসবাসকারী চীনা বংশোদ্ভূত স্থানীয়রা। পরবর্তীদের জাপানে জাইনিচি চাইনিজ (জাইনিচি চুগোকুজিন) বলা হয়। চীনা অভিবাসীরা জাপানি খাবারের ওপরও স্থায়ী প্রভাব রেখেছে-রামেন সম্ভবত চীনা উৎসের সবচেয়ে বিখ্যাত জাপানি খাবার।

  • 9 নাগাসাকি শিনচি চায়নাটাউন (নাগাসাকি শিনচি চূকাগাই), নাগাসাকি জাপানের প্রাচীনতম চায়নাটাউন, যা ১৫শ শতকে ফুঝোউ থেকে আগত চীনা ব্যবসায়ীরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে এলাকাটি বহু রেস্তোরাঁর জন্য পরিচিত, যেখানে জাপানি ধাঁচের চীনা খাবার পরিবেশন করা হয়। চীনা নববর্ষ উপলক্ষে লাল ফানুসে সাজানো রাস্তা বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। (Q63229)
  • 10 কাননাইমাচি (館内町), নাগাসাকি আগে তোজিন ইয়াশিকি (唐人屋敷) নামে পরিচিত, এটি ছিল নাগাসাকির চীনা ব্যবসায়ীদের আবাসিক এলাকা এডো যুগে। টোকুগাওয়া শোগুনতের বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতির কারণে তারা অধিকাংশ সময় এখানেই সীমাবদ্ধ থাকত। কদাচিৎ বাইরে যাওয়ার অনুমতি পেলে তাদের সঙ্গে সশস্ত্র প্রহরী থাকত যাতে স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত হয়। আজ এখানে কিছু চীনা মন্দির টিকে আছে। (Q6363939)
  • 11 নাগাসাকি কনফুসিয়াস মন্দির (長崎孔子廟), নাগাসাকি কনফুসিয়াসকে নিবেদিত একটি চীনা মন্দির, যা ১৮৯৩ সালে শহরের চীনা বাসিন্দারা তৎকালীন চিং রাজবংশের আর্থিক সহায়তায় নির্মাণ করেছিলেন। মন্দিরের জমি আজও টোকিওতে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের মালিকানাধীন। মন্দির চত্বরে চীনা ইতিহাসের একটি জাদুঘরও রয়েছে, যেখানে প্রায়ই চীনের জাদুঘরগুলো থেকে ধার আনা সামগ্রী প্রদর্শন করা হয়। (Q10944270)
  • 12 কোফুকু-জি (興福寺), নাগাসাকি নাগাসাকির প্রাচীনতম চীনা মন্দির, যা ১৬২৪ সালে ফুঝোউ থেকে আগত চীনা ব্যবসায়ীরা নির্মাণ করেছিলেন। (Q93616)
  • 13 সোফুকু-জি (সোফুকুজি), নাগাসাকি ১৬২৯ সালে ফুঝোউ থেকে আগত চীনা ব্যবসায়ীরা নির্মিত একটি চীনা বৌদ্ধ মন্দির। এর স্থাপত্যরীতি দক্ষিণ চীনের দেরি মিং যুগের আদর্শ উদাহরণ। বহু প্রাচীন স্থাপনার অংশ চীন থেকে এনে জাপানে বসানো হয়েছিল। (Q93616)
  • 14 নানকিন-মাচি (নানকিনমাচি), কোবি কোবির চায়নাটাউন গড়ে ওঠে ১৮৬৮ সালে, যখন শহরটি বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য উন্মুক্ত হয়। প্রথমে ফুজিয়ানগুয়াংডং থেকে আসা ব্যবসায়ীরা এখানে বসতি গড়েন, পরে নানজিং সহ চীনের নানা অঞ্চল থেকে অভিবাসীরা আসেন। এর ফলে এলাকার নাম হয় নানকিন-মাচি। এখানে অসংখ্য রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেখানে জাপানি ধাঁচের চীনা খাবার পরিবেশন করা হয়, পাশাপাশি গুয়ান ইউ-কে নিবেদিত একটি মন্দিরও রয়েছে। (Q912392)
  • 15 ইয়োকোহামা চায়নাটাউন (ইয়োকোহামা চূকাগাই), ইয়োকোহামা আধুনিক জাপানের বৃহত্তম চায়নাটাউন, যা ১৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। আজও এটি টোকিও মহানগর অঞ্চলের প্রধান চীনা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে রয়েছে অসংখ্য জাপানি ধাঁচের চীনা রেস্তোরাঁ, কয়েকটি চীনা মন্দির এবং দুটি চীনা স্কুল। (Q1141498)

কোরীয়

[সম্পাদনা]
ওসাকার সুরুহাশিতে কোরীয় রেস্তোরাঁ

জাপান ও কোরিয়ার মধ্যে যোগাযোগ বহু হাজার বছরের পুরোনো। তবে আধুনিক যুগে জাপানে কোরীয় সম্প্রদায়ের মূল শিকড় গড়ে ওঠে কোরিয়ায় জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে (১৯১০-১৯৪৫)। সেই সময় বহু কোরীয় শ্রমিককে চুক্তিভিত্তিকভাবে জাপানে আনা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জাপান পরাজিত হলে অনেকেই স্বদেশে ফিরে যায়, কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ জাপানেই থেকে যায়। তাদের বংশধরদের আজকে ‘‘জাইনিচি কোরীয়’’ নামে চেনে সবাই।

জাপানে জাইনিচি কোরীয়দের প্রতিনিধিত্ব করে দুটি সংগঠন-উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্ত ‘‘চোংরিয়ন’’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্ত ‘‘মিনদান’’। এই দুটি সংগঠনই কোরীয় সম্প্রদায়ের জন্য বিদ্যালয় পরিচালনা করে।

এছাড়া, ‘‘ইয়াকিনিকু’’ বা জাপানি বারবিকিউ মাংসের প্রচলন প্রথমে কোরীয় অভিবাসীরাই জাপানে এনেছিল। পরে তা জাপানি স্বাদের সঙ্গে মানিয়ে পরিবর্তিত হয়ে জনপ্রিয়তা পায়।

  • 17 উতোরো শান্তি স্মারক জাদুঘর (উতোরো হেইওয়া কিনেনকান), উজি, কিয়োটো প্রিফেকচার উতোরো শান্তি স্মৃতি জাদুঘর জাপানের উজি শহরের উতোরো এলাকায় অবস্থিত। এখানে অধিকাংশ বাসিন্দাই জাইনিচি কোরীয়। দীর্ঘদিন ধরে জাপানি সরকার এই অঞ্চলকে উপেক্ষা করে এসেছে। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরীয় সরকারের সহায়তায় এই জাদুঘর নির্মিত হয়। এখানে কোরিয়ায় জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস এবং জাপানে জাইনিচি কোরীয় সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রদর্শনী সাজানো হয়েছে।
  • 18 কোমা মন্দির (কোমা জিঞ্জা), হিদাকা, সাইতামা প্রিফেকচার অষ্টম শতকে গোগুরিয়ো কোরীয় রাজ্য পতনের পর কিছু শরণার্থী জাপানে আশ্রয় নেন। তারা সেখানেই একটি শিন্তো মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের সাথে তাদের বংশধরেরা ধীরে ধীরে জাপানি সমাজে মিশে যায় এবং আলাদা কোরীয় পরিচয় ধরে রাখেনি। তবে মন্দিরটিতে এখনো প্রতিষ্ঠাতাদের কোরীয় ঐতিহ্যের কিছু নিদর্শন রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রবেশপথের কাছে স্থাপিত দুটি কোরীয় স্তম্ভ (পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ) এবং গোগুরিয়ো অভিজাতদের মূর্তি। (Q10855289)
  • 19 সুরুহাশি (সুরুহাশি), ইকুনো, ওসাকা ওসাকার একটি এলাকায় জাপানের অন্যতম বৃহৎ কোরীয় সম্প্রদায় বাস করে। এলাকাটি বিশেষভাবে পরিচিত কোরীয় বারবিকিউ রেস্তোরাঁগুলির জন্য, যা স্থানীয়দের কাছে খুব জনপ্রিয়।

আমেরিকান

[সম্পাদনা]

কমোডর ম্যাথিউ সি. পেরির ‘‘কালো জাহাজ’’ নিয়ে আগমনের আগে জাপানে খুব কম আমেরিকান প্রবেশের অনুমতি পেতেন। ১৮৫৪ সালে তার সঙ্গে কানাগাওয়া কনভেনশন স্বাক্ষরের মাধ্যমে জাপানকে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যে উন্মুক্ত হতে বাধ্য করা হয়। এতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা একঘরে নীতি (আইসোলেশন) ভেঙে যায় এবং ১৮৬৮ সালে শোগুনতন্ত্র পতনের পথ তৈরি হয়। যেহেতু পেরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ছিলেন, এই চুক্তির ফলে স্বাভাবিকভাবেই জাপানে আমেরিকানদের প্রবেশ বাড়ে। একই সঙ্গে, জাপান বুঝতে পারে যে কেবল ‘‘ডাচ লার্নিং’’ বা ডাচ জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না, কারণ তখন ডাচরা আর বিশ্ব রাজনীতির বড় শক্তি নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান অভিবাসন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। যারা তখন জাপানে বাস করছিলেন, আমেরিকানসহ মিত্রশক্তির নাগরিকরা তাদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র জাপানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে এবং ওকিনাওয়া দ্বীপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। বিপুল সংখ্যক আমেরিকান সেনা সেখানে অবস্থান করতে থাকে, যাদের বেশিরভাগ ওকিনাওয়াতে পাঠানো হয়। এসময় সেনাদের পাশাপাশি সাধারণ আমেরিকান নাগরিকদের সঙ্গেও জাপানিদের সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটে। ১৯৭২ সালে ওকিনাওয়া আনুষ্ঠানিকভাবে জাপানের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র আজও সেখানে সক্রিয় সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে এবং জাপানের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ঘাঁটি ব্যবহার করছে।

এই ইতিহাসের কারণে ওকিনাওয়া এবং জাপানের অন্যান্য অঞ্চলে আমেরিকানদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য দেখা যায়। ঘাঁটি-সংক্রান্ত সমস্যায় সময়ে সময়ে প্রতিবাদ হয়-বিশেষ করে কোনো সেনা সদস্য স্থানীয়দের বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্ত হলে। তবুও, আমেরিকান সাংস্কৃতিক প্রভাব আজও জাপানজুড়ে শক্তভাবে টিকে আছে, আর আধুনিক অনেক ধারণার জন্য জাপানি ভাষায় সরাসরি ইংরেজি থেকে শব্দ ধার করা হয়েছে।

  • 20 শিমোদা দক্ষিণ ইজু উপদ্বীপেই কমোডর পেরি তার বিখ্যাত কালো জাহাজ নিয়ে অবতরণ করেন, যা জাপানের দরজা উন্মুক্ত করার দিকে নিয়ে যায়। এই শহরে দর্শনার্থীরা জাহাজের একটি প্রতিরূপে ভ্রমণ করতে পারেন, পেরির বন্দরে তার স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে পারেন, এবং সেই মন্দিরে যেতে পারেন যেখানে তাকে আলোচনার জন্য আনা হয়েছিল।
  • 21 আমেরিকান ভিলেজ (আমেরিকান বিরেজ্জি)। ওকিনাওয়ার আমেরিকান সামরিক ঘাঁটির কাছে মিহামার আমেরিকান ভিলেজ হলো দোকান, হোটেল এবং বিনোদনকেন্দ্রের সমাহার। ঘাঁটি থেকে আমেরিকানরা প্রায়ই পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে এখানে আসে, তাই এই এলাকায় এমন সব জায়গা আছে যেখানে আমেরিকান স্বাদের খাবার ও বিনোদন দেওয়া হয়, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাধারণ জাপানি ধাঁচের জায়গাগুলো থেকে আলাদা।
  • 22 মিসাওয়া মিসাওয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যা শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রতিবছর নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহান্তে পালিত হয় ‘‘জাপান ডে’’, যেখানে আমেরিকানদের জন্য জাপানি সংস্কৃতির বিভিন্ন আয়োজন থাকে। জুনের প্রথম সপ্তাহান্তে পালিত হয় ‘‘আমেরিকান ডে’’, যেখানে ঘাঁটির আমেরিকানরা স্থানীয়দের জন্য নিজেদের সংস্কৃতি প্রদর্শন করে এবং নানা স্টল বসায়।

এছাড়া সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ‘‘মিসাওয়া এয়ার শো’’ শহরের অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। এ সময় ঘাঁটিটি সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং সামরিক বিমানের চমকপ্রদ প্রদর্শনী হয়। এর প্রধান আকর্ষণ হলো যুদ্ধবিমান প্রদর্শনী।

সম্মান

[সম্পাদনা]

জাপানে জাতিগত সংখ্যালঘুরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বৈষম্যের শিকার হয়েছে। মেইজি পুনর্স্থাপনের পর সরকার একটি একজাতি, অভিন্ন জাপানি জাতিরাষ্ট্র গড়ে তুলতে চেয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে সেই সাংস্কৃতিক একীভূতকরণের নীতি শিথিল হয়। ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর সংস্কৃতি আবার প্রকাশ্যে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়। তবুও অনেক সংখ্যালঘুর মধ্যে এখনো জাপানি সরকারের প্রতি কিছুটা অবিশ্বাস রয়ে গেছে। তাই একজন ভ্রমণকারী হিসেবে তাদের ইতিহাস নিয়ে আলাপ করার সময় সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে, আধুনিক যুগে সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে চলাই ভালো।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]
This TYPE জাপানের সংখ্যালঘু সংস্কৃতি has রূপরেখা অবস্থা TEXT1 TEXT2

{{#assessment:প্রসঙ্গ|রূপরেখা}}

বিষয়শ্রেণী তৈরি করুন