বোঝা
[সম্পাদনা]এই নিবন্ধে আলোচিত শহরটিকে সাধারণত ইরাকের বাইরে "নাজাফ" বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি দুটি শহর নিয়ে গঠিত, যেগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একত্রে বৃদ্ধি পেয়ে একীভূত হয়েছে। এগুলো হলো পশ্চিমে নাজাফ এবং পূর্বে কুফা (কখনও কখনও কুফাহ লেখা হয়)। উভয়কেই শিয়া মুসলমানরা পবিত্র বলে মনে করেন, কারণ এখানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের কবর রয়েছে। এছাড়াও ওনাদের জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নাজাফ/কুফায় সংঘটিত হয়েছিল। এজন্য নাজাফে আগত দর্শনার্থীদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই শিয়া তীর্থযাত্রী (আরবিতে যাদের বলা হয় ‘‘জুয়ার’’, একবচনে ‘‘জাইর’’), এবং তারা সাধারণত ধর্মীয় আলেমের নেতৃত্বে দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করেন। তবে এখন স্বাধীনভাবে ভ্রমণও সম্ভব।
পৌঁছানো
[সম্পাদনা]রাজধানী বাগদাদ থেকে প্রতিদিন কয়েকটি ফ্লাইট রয়েছে, তেমনিভাবে ইরানের বিভিন্ন শহর থেকেও জাতীয় বিমান সংস্থা ইরাকি এয়ারওয়েজ[অকার্যকর বহিঃসংযোগ] নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে। এছাড়াও ইস্তাম্বুল ও দুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক কেন্দ্র থেকেও সীমিত সংখ্যক ফ্লাইট রয়েছে।
- 1 আল নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (শহরের কেন্দ্র থেকে দক্ষিণ-পূর্বে)।
আপনি বাগদাদ, কারবালা এবং অন্যান্য শহরে শেয়ার্ড ট্যাক্সিতে যাতায়াত করতে পারেন। কারবালা থেকে/কারবালায় ভাড়া ৩,০০০ ইরাকি দিনার (একপথে ৭৬ কিমি), নাসিরিয়াহ থেকে/নাসিরিয়াহয় ১৫,০০০ দিনার (২৫৬ কিমি), হিল্লাহ থেকে/হিল্লায় ৭,৫০০ দিনার এবং বাগদাদ থেকে/বাগদাদে ১৫,০০০ দিনার (অক্টোবর ২০২২ অনুসারে)।
- 2 নাজাফ নর্দার্ন গ্যারেজ। উত্তরমুখী শেয়ার্ড ট্যাক্সি (যেমন: বাগদাদের উদ্দেশ্যে) এখান থেকে ছাড়ে।
শহরে চলাচল
[সম্পাদনা]কারিম (উবারের মালিকানাধীন রাইডশেয়ার অ্যাপ) নাজাফ চালু রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ করে। তবে ইমাম আলী মসজিদের চারপাশে চেকপোস্ট রয়েছে, সেক্ষেত্রে "কারিম ওল্ড সিটি" সেবা নিতে হতে পারে (যার ভাড়া সাধারণ কারিম পরিষেবার সমান প্রায়)।
দর্শনীয় স্থান
[সম্পাদনা]
নাজাফ ‘‘ইমাম আলী’’ বা ‘‘আলী ইবনে আবি তালিবের" মাজারস্থল হিসেবে প্রসিদ্ধ। তিনি শিয়াদের প্রথম ইমাম, হযরত মুহাম্মদের চাচাতো ভাই ও জামাতা। তিনি সুন্নি ও শিয়া উভয়ের কাছেই ন্যায়পরায়ণ খলিফা হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে এটি শিয়া ইসলামী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তীর্থকেন্দ্র। অনুমান করা হয় যে শুধুমাত্র মক্কা ও মদিনাতেই এর চেয়ে বেশি মুসলিম তীর্থযাত্রী আসেন। ইসলামের দ্বিতীয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের সমাধিস্থল হিসেবে ইমাম আলী মসজিদকে শিয়ারা ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান বলে মনে করেন।
ইমাম আলী মসজিদ একটি জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপনা, যার সোনালি গম্বুজ এবং দেয়ালে বহু মূল্যবান বস্তু রয়েছে। নিকটেই রয়েছে ওয়াদি-উস-সালাম কবরস্থান, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবরস্থান হিসেবে খ্যাত। এখানে বহু নবীর কবর রয়েছে এবং সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা চান এখানে সমাধিস্থ হতে, যেন কিয়ামতের দিনে ইমাম আলীর সাথে পুনরুত্থিত হতে পারেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ মাজার ঘিরে বহু খানকাহ, বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার ও সুফি আস্তানা গড়ে উঠেছে, যা শহরটিকে শিয়া জ্ঞানচর্চা ও ধর্মতত্ত্বের কেন্দ্রস্থলে পরিণত করেছে।
নাজাফ মাদ্রাসা ইসলামী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র। আয়াতুল্লাহ খামে
আফগানিস্তানের শহর মাজার-ই শরিফেও একটি স্থান রয়েছে, যেটিকে আলীর কবর দাবি করা হয় এবং বহু তীর্থযাত্রী সেখানে যান, তবে নাজাফের দাবি অধিক স্বীকৃত।
- 1 আল-কাদিসিয়াহ (নজাফ থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে)। একটি ঐতিহাসিক নগরী, যা ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধের জন্য কুখ্যাত। এই যুদ্ধে রাশিদুন খিলাফতের বাহিনী সাসানীয় সাম্রাজ্যের শাসক রোস্তম ফাররুখজাদের প্রেরিত পারস্য বাহিনীকে পরাজিত করেছিল।
- 2 কুফার বৃহৎ মসজিদ। স্থাপত্যিক গুরুত্বের পাশাপাশি এই মসজিদ ঐতিহাসিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানেই ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে (৪০ হিজরি) ইমাম আলীকে হত্যা করা হয়েছিল। তীর্থযাত্রীরা সেই মিহরাবে শ্রদ্ধা জানায়, যেখানে তিনি সিজদায় ছিলেন এবং পিছন থেকে তরবারি আঘাত করা হয়।
- 3 আল-হিরাহ ধ্বংসাবশেষ। প্রাচীন নগরী।
- 4 নাজাফ হেরিটেজ মিউজিয়াম (متحف التراث النجفي)। একটি ঐতিহাসিক ‘খান’-এ অবস্থিত এ জাদুঘরে নজাফের সমৃদ্ধ ইতিহাসের নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষভাবে ১৯২০ সালের ইরাকি বিদ্রোহ সম্পর্কিত প্রদর্শনী এখানে রয়েছে, যা জমি ও দাফন কর সংক্রান্ত কারণে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক প্রধান গণআন্দোলন ছিল।
- 5 ওয়াদি-উস-সালাম (وادي السلام)। একটি ইসলামী কবরস্থান, যা বিশ্বের বৃহত্তম কবরস্থান হিসেবে পরিচিত। এখানে হুদ ও সালিহ নবীর কবরসহ শিয়া আলেমদের মধ্যে মুহাম্মদ বাকির আল-সদর ও আল্লামা তাবাতাবাই, এবং সামরিক/রাজনৈতিক নেতা আবু মাহদি আল-মুহান্দিসের কবর রয়েছে।
নাজাফের পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ অঞ্চলে কয়েকটি ‘‘খান’’ (কখনও ‘‘কারাভানসেরাই’’ বলা হয়) রয়েছে। এগুলো ছিল প্রাচীন কালে পথের ধারে নির্মিত দুর্গসদৃশ সরাইখানা, যেখানে যাত্রীরা রাত্রি যাপন করত। নাজাফ থেকে কারবালা পর্যন্ত ঐতিহাসিক পথে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য খান রয়েছে, যা বাণিজ্য ও ধর্মীয় যাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
- 6 খান আল-নুস। নজাফ ও কারবালার মধ্যবর্তী সড়কে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ‘‘খান’’ বা সরাইখানা।
করণীয়
[সম্পাদনা]কেনাকাটা
[সম্পাদনা]মূদ্রা
[সম্পাদনা]ভিড় এলাকায় রাস্তায় ছোট ছোট টেবিলে স্বতন্ত্র মানি-চেঞ্জাররা বসে থাকে। তারা সাধারণত ‘‘আনুষ্ঠানিক’’ স্থানগুলোর (যেমন: বিমানবন্দর) তুলনায় ভালো রেট দেয় এবং প্রায়ই স্থানীয় সিমকার্ডও বিক্রি করে।
স্মারক
[সম্পাদনা]নাজাফ থেকে সাধারণত কেনা হয় তসবিহ (জপমালা), তুরবা (একটি ছোট মাটির ট্যাবলেট, যার উপর শিয়া মুসলমানরা নামাজে সিজদা করে) এবং আকিকের আংটি। তীর্থযাত্রীদের ভিড় এলাকায় অসংখ্য দোকানে এগুলো সহজলভ্য।
খাওয়া
[সম্পাদনা]{নাজাফ ইরাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শহর। এখানে সাধারণত যে খাবারগুলো বেশি প্রচলিত:
1. রুটি জাতীয় খাবার
খুব্জ (Khubz) – ইরাকি রুটি, তন্দুরে তৈরি হয়।
সামুন (Samoon) – বিশেষ আকারের নরম রুটি।
2. ভাত জাতীয় খাবার
বিরিয়ানি ও পুলাও – মাংস, মসলা ও সবজি দিয়ে।
মাকলুবা (Maqluba) – ভাত, মাংস ও বেগুন/সবজি একসাথে রান্না করা হয়।
3. মাংস ও কাবাব
কাবাব (খাস করে ভেড়ার মাংস দিয়ে)।
কোফতা – মাংসের কিমা দিয়ে বানানো বল বা লম্বা আকারের কাবাব।
তাশরীব – মাংস ও রুটি দিয়ে স্যুপ জাতীয় খাবার।
4. সবজি ও ডালজাতীয় খাবার
মুজাদারা – ডাল ও চাল মিশিয়ে রান্না।
ফলাফেল – ছোলার ডালের ভাজা বড়া, রুটি বা সসের সঙ্গে খাওয়া হয়।
5. মিষ্টি জাতীয় খাবার
কুনাফা – মিষ্টি সেমাই জাতীয় খাবার, চিজ দিয়ে বানানো হয়।
বাকলাভা – মধু ও বাদাম দিয়ে তৈরি মিষ্টি।
6. পানীয়
চা – নাজাফসহ ইরাকজুড়ে গাঢ় কালো চা প্রচলিত।
কাহওয়া (কফি) – খেজুর বা মিষ্টি দিয়ে পরিবেশন করা হয়।
∆ নাজাফ অঞ্চলের মানুষ সাধারণত ভাত, মাংস, রুটি, ডাল, খেজুর এবং চা সবচেয়ে বেশি খেয়ে থাকে।}
পানীয়
[সম্পাদনা]নাজাফের ব্যস্ত এলাকায় ছোট কাপের কালো চা বিক্রি হয়। দাম মাত্র ২৫০ দিনার হতে পারে, চিনি সহ বা চিনি ছাড়া পরিবেশন করা হয়।
আবাসন
[সম্পাদনা]- 1 আল সাহলা ল্যান্ড হোটেল (فندق ارض السهلة), আল রাসূল রোড, ☏ +৯৬৪ ৭৮০ ০০৭ ৭৭৭০।
- 2 জমজম হোটেল, ☏ +৯৬৪ ৭৫০ ৯০৮ ৪৪৭৫।
- 3 কাসের আলদিয়াফা হোটেল, ☏ +৯৬৪ ৭৭১ ০০১ ০০১০।
- কাসর আলদুর হোটেল, ☏ +৯৬৪ ৭৮০১০১৯০১৯। ইরাকি মানদণ্ডে কিছুটা ব্যয়বহুল হলেও, এই হোটেলের সুবিধা হলো—এর লেটারহেডে মুদ্রিত বুকিং নিশ্চিতকরণ পত্র ভিসা অন অ্যারাইভালের সময় অভিবাসন দপ্তরে গ্রহণযোগ্য বলে নিশ্চয়তা রয়েছে, যেখানে কিছু তীর্থযাত্রী ছোট হোটেলের নিশ্চিতকরণ পত্র ব্যবহার করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন।
সতর্কতা
[সম্পাদনা]ইরাক নিবন্ধের সতর্কীকরণ দেখুন।
তবে নাজাফ ইরাকের অন্যতম নিরাপদ শহর। শহরটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে শিয়া অধ্যুষিত হওয়ায় এখানে আইএসআইএস ও আল-কায়েদা কখনোই জনসমর্থন পায়নি। সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর (অত্যন্ত কার্যকর) ঘন জাল ছক রয়েছে, বিশেষত মসজিদ ও মাজারের মতো তীর্থকেন্দ্রিক এলাকায়। অভ্যন্তরীণ মাজার এলাকায় প্রবেশের আগে একাধিকবার শরীর তল্লাশি হতে পারে।
সম্মান প্রদর্শন
[সম্পাদনা]নাজাফ শিয়া ইসলামের একটি পবিত্র নগরী, তাই এটি অত্যন্ত রক্ষণশীল—মধ্যপ্রাচ্যের মানদণ্ডেও। ইরাকের কিছু তুলনামূলক উদার শহরের মতো এখানে মদ্যপান খোঁজার চেষ্টা করবেন না। নারীদের ইরানি ধাঁচের চাদর পরিধান করতে হয়।
সংযোগ
[সম্পাদনা]পরবর্তী ভ্রমণ
[সম্পাদনা]নাজাফ আসা অধিকাংশ দর্শনার্থী শিয়া তীর্থযাত্রী। ইরাকে এই তীর্থযাত্রাকে আরবিতে ‘‘জিয়ারাহ’’ বলা হয়। একটি ‘‘সম্পূর্ণ’’ জিয়ারাহর মধ্যে নাজাফের পর কারবালা, বাগদাদের কাধিমাইন এবং সামর্রা ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত থাকে, কারণ এগুলোতেও অন্যান্য ইমামদের (শিয়াদের মতে হযরত মুহাম্মদের বারো উত্তরসূরি) সমাধিস্থল রয়েছে। তুলনামূলকভাবে ছোট তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে হিল্লাহ ও বালাদ উল্লেখযোগ্য।
{{#assessment:শহর|রূপরেখা}}
