পিটন দে লা ফোরনেস (যার মানে বাংলায় “চুল্লি পাহাড়”) হলো রিইউনিয়নের একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি।এখানে দারুণ কিছু হাঁটার পথ রয়েছে। পুরো পথটি প্রায় ১৪.৫ কিলোমিটার, আর তা অতিক্রম করতে সময় লাগে প্রায় ৫ ঘণ্টা। একে বলা যায় পূর্ব আফ্রিকার দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর হাঁটার অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে একটি।
এই পথটি যেহেতু রিইউনিয়ন জাতীয় উদ্যানের “ভেতরের অঞ্চলের” মধ্যে পড়ে, তাই এটি একটি বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকায় অবস্থিত।
জানুন
[সম্পাদনা]ফোরনেস আগ্নেয়গিরির ঢালে হাঁটলে আপনি এক অনন্য অভিজ্ঞতা পাবেন। এখানে হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে আপনি যেন খনিজে ভরা এক জমাটভূমিতে হাঁটছেন, যা তৈরি হয়েছে বারবার লাভার প্রবাহ থেকে। ফুকে ঘেরের ভেতরের পথগুলো ধরে হাঁটতে দ্বিধা করবেন না, এমনকি যদি নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যও না থাকে। কারণ হাঁটার সাথে সাথে আপনি ভিন্ন রকমের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন এবং কাছ থেকে দেখতে পারবেন ফর্মিকা লিও নামের ছোট আগ্নেয়গিরির ঢিবিটি। ঘেরের ভেতরের সব পথই শুধু সাদা রঙের বিন্দু দিয়ে চিহ্নিত করা আছে, যা একটার পর একটা ঘনভাবে দেওয়া থাকে। তাই পথগুলো অনুসরণ করা সহজ, কিন্তু একবার পথ ছেড়ে গেলে আবার খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। যদি কখনও সন্দেহ হয়, তবে দেখুন অন্য ভ্রমণকারীরা কোন পথে যাচ্ছে যারা হারিয়ে গেছে মনে হচ্ছে না এবং কোনো অবস্থাতেই চিহ্নিত পথ থেকে সরে যাবেন না।
২০০৭ সালে ডলোমিয়ু গহ্বর ধসে পড়ার পর থেকে বোরি গহ্বরের প্রবেশপথ এবং গহ্বর ঘুরে দেখার রাস্তা বন্ধ রাখা হয়েছে।

প্রস্তুতি
[সম্পাদনা]কী কী জিনিস সঙ্গে নিতে হবে তা জানতে দেখুন রিউনিয়ন-এ পাহাড়ি পথচলা § প্রস্তুতি, এখানে বিস্তারিত বলা আছে। এই পথের ক্ষেত্রেও সেই সব তথ্যই প্রযোজ্য।
কিভাবে পৌঁছাবেন
[সম্পাদনা]পথে কীভাবে যাওয়া যায় সে সম্পর্কে তথ্যের জন্য দেখুন পিটন দে লা ফোরনেস সম্পর্কিত নিবন্ধ।
অভ্যন্তরীণ ক্যালডেরা "আঁক্লো ফুকে" যেখানে আগ্নেয়গিরির শঙ্কু এবং দুটি শীর্ষ অগ্নিকুণ্ড রয়েছে, সেখানে দর্শনার্থীদের যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো বেলেকম্বে গিরিপথের পার্কিং এলাকা (উচ্চতা ২৩১১ মিটার) থেকে আগ্নেয়গিরির খাড়া প্রান্ত বেয়ে নেমে আসা। এই নামার পথে প্রায় ১০০ মিটার নিচে নামতে হয় এবং সময় লাগে প্রায় ২০ মিনিট। যেহেতু এটাই একমাত্র নামার রাস্তা, তাই পুরো এলাকাটি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং এবং আগ্নেয়গিরির ঝুঁকির পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে প্রবেশপথ সহজেই বন্ধ করে দিতে পারে। আগ্নেয়গিরির বিপদজনক অবস্থার ওপর নির্ভর করে, দুটি শীর্ষাগ্নিকুণ্ড ঘুরে দেখা কখনো সম্ভব হয়, আবার কখনো হয় না। তাই নামার পথে দেওয়া ফলকে লেখা তথ্য অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। এই স্থানে প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
হাঁটা
[সম্পাদনা]প্রথমেই আপনি পৌঁছে যাবেন "নেজ ডি বুফ" গিরিপথে (উচ্চতা ২১৩৬ মিটার)। সজীব সবুজ অরণ্যের ভেতর দিয়ে হাঁটার পর এখানে দাঁড়িয়ে আপনি দেখতে পাবেন "প্লেন দে সাবল" বা বালুর সমভূমির চমৎকার বিস্তৃত দৃশ্য। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতে তৈরি এই কালো বালুর সমতল আপনাকে সামনে কী অপেক্ষা করছে তার একটি ইঙ্গিত দেয়। এখান থেকে একটি পথ (আসলে ধুলোমাখা গর্তযুক্ত ট্র্যাক) আপনাকে নিয়ে যাবে "বেলেকম্বে গিরিপথের" দিকে (২,৩১১ মিটার)। পার্কিং এলাকা থেকে কয়েক মিটার হাঁটলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে "ফোরনেসের" মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
এটা সত্যিই শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য চোখের সামনে যেন চাঁদের মতো এক ভিন্ন জগতের প্রান্তর উন্মোচিত হয়। এখান থেকে নামার একমাত্র পথই আপনাকে নিয়ে যাবে "ফোরনেসর" দিকে। এই পথ ধরে নামার সময় প্রায় ১৫০মিটার উচ্চতা নামতে হয়, আর সেই সঙ্গে পেরোতে হয় প্রায় ৫৮০টি ধাপ (আমরা গুনেছি!)। ভাগ্য ভালো যে পুরো পথজুড়ে একটি রেলিং রয়েছে, কারণ এই “ধাপগুলো” কোনোভাবেই স্বাভাবিক সিঁড়ির মতো নয়—কোনোটি মাত্র ১০ সেন্টিমিটার, আবার কোনোটি ৪০ সেন্টিমিটার উঁচু, আর এগুলো গঠিত হয়েছে পাথর, মাটি, গাছের শিকড়, কংক্রিট আর নুড়ি দিয়ে। তবু ক্যালডেরার দেওয়াল বেয়ে এই নেমে যাওয়ার পথ আপনাকে নিয়ে যায় তেঁতুলগাছের ছায়ায় ভরা পথে, তাই হাঁটতে গিয়ে খুব একটা অস্বস্তিও লাগে না।
নিচে নেমে আসার পর আপনার প্রথম গন্তব্য হবে "ফর্মিকা লেও"। এটি একটি ছোট আগ্নেয়গিরি, যা ১৭৫৩ সাল থেকে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। এর লালচে শীর্ষ থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রায় ২০ মিটার উঁচু ছাইয়ের স্তূপ, যা গঠিত হয়েছে সক্রিয় সময়কার একাধিক অগ্ন্যুৎপাতের ফলে।
পুরো পথটাই সাদা চিহ্ন দিয়ে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা আছে। প্রায় প্রতি ২ মিটার পরপর বসানো এই সাদা চিহ্নগুলো হঠাৎ কুয়াশা নেমে এলে অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে এগুলোই আপনাকে আবার শুরুর পথে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। খেয়াল রাখবেন যেন এগুলো থেকে খুব বেশি দূরে না সরে যান, কারণ সেখানে পথ হারালে পরের দিন সকাল পর্যন্ত উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, আর রাতের সময় সেখানে বেশ ঠান্ডা থাকে!
"ফর্মিকা লেও" পেরোনোর পর দিকনির্দেশক ফলকগুলো আপনাকে চূড়ার দিকে নিয়ে যাবে। এই পথ তৈরি হয়েছে পুরনো লাভা দিয়ে, যা শক্ত ও মসৃণ মাটির মতো। একটি ছোট ফলকে লেখা থাকে যে এটি “লাভ কোরদে” দিয়ে গঠিত এক ধরনের ব্যাসাল্টিক, মসৃণ ও তরল লাভা, যাকে “পাহোহো” লাভাও বলা হয়। এখান থেকে পথটি ধীরে ধীরে একেবারে চাঁদের পৃষ্ঠের মতো প্রাকৃতিক দৃশ্যে প্রবেশ করে, আর শুরু হয় দীর্ঘ আরোহন, যেখানে আপনাকে অতিক্রম করতে হবে অপেক্ষাকৃত নতুন সৃষ্ট লাভার উপর দিয়ে।
এখানে পথ চিনে নিতে তেমন কোনো সমস্যা হয় না, শুধু অন্য দর্শনার্থীদের ভিড় অনুসরণ করলেই চলবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে কিছু ব্যাপারে। পর্যাপ্ত পানি পান করবেন, আর এই ২২০০ মিটার উচ্চতায় ঠান্ডা হাওয়া থাকলেও ভুল করে এটাকে আরাম ভেবে বসবেন না। সূর্যের রোদ কুয়াশার আড়াল দিয়েও অত্যন্ত প্রখর হয়। তাই মাথা ঢেকে রাখুন এবং শরীরের যেসব অংশ সূর্যের সামনে থাকে যেমন হাত, মুখ, গলা, এমনকি পা পর্যন্ত—অবশ্যই রোদ থেকে সুরক্ষার ক্রিম ব্যবহার করুন। তা না হলে কয়েকদিন ভয়ানক রোদ পোড়ার কষ্ট সহ্য করার জন্য তৈরি থাকতে হবে।
পার্কিং এলাকা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটার পর (যা পুরো পথের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ), আপনি অবশেষে পৌঁছে যাবেন বোড়ি আগ্নেয়গিরির চূড়ায়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা ২৬৩১ মিটার। ছোট্ট এই আগ্নেয়গিরির ব্যাস মাত্র ৩৫০ মিটার এবং এটি ১৯৭১ সাল থেকে নিষ্ক্রিয় আছে। মুহূর্তটিকে স্মৃতিতে ধরে রাখতে ছবি বা ভিডিও তোলার জন্য এটি একদম উপযুক্ত স্থান।
সাদা চিহ্নগুলো অনুসরণ করে হাঁটতে হাঁটতে এবার আপনি পৌঁছে যাবেন দোলোমিয়ু আগ্নেয়গিরির দিকে (ব্যাস প্রায় ১ কিমি), যা এখনো সক্রিয়। চারপাশে ভেসে বেড়ানো ধোঁয়ার গন্ধই আপনাকে তা স্মরণ করিয়ে দেবে। এই পথটি আগ্নেয়গিরি দ্বারা ঘিরে থাকে, আর চলার পথে আপনাকে অতিক্রম করতে হবে সদ্য সৃষ্ট লাভার উপর দিয়ে। হাঁটতে গিয়ে নিশ্চয়ই আপনার পায়ে উত্তাপ টের পাবেন, আর পদতলে শুনবেন ঝনঝন, ভাঙা কাঁচের মতো শব্দ। পথে কয়েকটি ফলক রয়েছে, যা সাবধান করে দেয় আগ্নেয়গিরির আরও কাছে যাওয়ার জন্য পাথরের ঢালে নেমে যাওয়া কতটা বিপজ্জনক। তবে আগ্নেয়গিরির প্রান্তে বসানো ভূকম্পন মাপক যন্ত্রগুলো দেখে অন্তত কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হওয়া যায়।
চূড়ায় সময় কাটানো শেষ হলে ফিরে যাওয়ার পালা। গাড়ির কাছে পৌঁছাতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা হাঁটতে হবে, আর ভুলবেন না, ফেরার পথে আবারও আপনাকে সেই ৫৮০ টি ধাপ বেয়ে ওপরে উঠতে হবে!
নিরাপদ থাকুন
[সম্পাদনা]
আরো জানতে দেখুন রিইউনিয়নে পাহাড়ি পথে হাঁটা § নিরাপদ থাকুন – সেখানে কী কী সঙ্গে রাখতে হবে তা লেখা আছে। ঐ সব তথ্য এই পথের জন্যও প্রযোজ্য।
যখন আবহাওয়া ভালো থাকে, তখন উঁচুতে সূর্যের তীব্র আলো আর কালো আগ্নেয়গিরির পাথরে তার তীব্র উত্তাপের প্রভাবকে মাথায় রাখতে হবে। সঙ্গে পর্যাপ্ত রোদ থেকে সুরক্ষা আর যথেষ্ট পরিমাণে পানীয় জল রাখা দরকার।
এটাও গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখতে হবে যে বৃষ্টি আর কুয়াশা প্রায় সারা বছরই বিকেলের পর থেকে হঠাৎ আসতে পারে। এর ফলে রাস্তা ভিজে যায় আর কখনো কখনো বাসল্ট পাথর (অগ্নি থেকে সৃষ্ট কালো শক্ত পাথর) খুবই পিছল হয়ে ওঠে। এ কারণে মজবুত জুতো দরকার, কারণ এসব বাসল্ট পাথর বেশ ধারালো, যেহেতু এগুলো খুব নতুনভাবে তৈরি হয়েছে। এছাড়া সঙ্গে থাকা উচিত জল আটকাতে পারে এমন রেইনকোট আর একটি গরম সোয়েটার, কারণ বৃষ্টির সময় তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যায়। বিকেলের দিকে সাধারণত আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায়, তাই সকালে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
পাহাড়ি পথচারীদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হতে পারে কুয়াশায় পথ ভুলে যাওয়া। পুরো পথটাই এমন এক জায়গা দিয়ে উপরে ওঠে যেখানে কোনো গাছপালা নেই, মাটি নেই, শুধু আগ্নেয়গিরির পাথুরে ভূমি। তাই বিশেষ কোনো দিক চেনার মতো অবস্থাও থাকে না। যখন আবহাওয়া পরিষ্কার থাকে আর দৃষ্টিসীমা ভালো থাকে তখন মানুষ প্রায়ই নিজের মতো করে পথ ধরে হাঁটে, ফলে নতুন তৈরি আগ্নেয়গিরির পাথরে বড় অংশজুড়ে কোনো স্থায়ী পথ তৈরি হয়নি। তাই স্পষ্ট কোনো চড়াইয়ের দিকও নেই। কুয়াশা নামলে আলোর ছড়িয়ে যাওয়ার কারণে চারপাশ অস্পষ্ট হয়ে যায়, আর সাদা রঙের পথচিহ্নগুলোও সবসময় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে না। এর ফলে নির্দিষ্ট পথে না চললে খুব সহজেই দিক নির্ণয় কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
পরবর্তী ভ্রমণ
[সম্পাদনা]- রিইউনিয়ন জাতীয় উদ্যানের বাকি অংশ ঘুরে দেখুন
{{#assessment:ভ্রমণপথ|ব্যবহারযোগ্য}}