বৌদ্ধ সার্কিট ভ্রমণপথটি গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান থেকে মহাপরিনির্বাণ লাভের স্থান পর্যন্ত পদচিহ্ন অনুসরণ করে। আন্তর্জাতিক এই সার্কিটটি ভারত ও নেপাল জুড়ে বিস্তৃত। যার মধ্যে রয়েছে লুম্বিনী (জন্মস্থান), বোধগয়া (জ্ঞানপ্রাপ্তির স্থান), সারণাথ (প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন) এবং কুশীনগর (মৃত্যুস্থান)।
বোঝা
[সম্পাদনা]এই চারটি স্থান দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে বহু তীর্থযাত্রীকে এটি আকর্ষণ করে। স্থানগুলো বৌদ্ধধর্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মন্দির, অতিথিশালা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। যা অ-বৌদ্ধদের জন্যও দর্শনযোগ্য।
প্রস্তুতি
[সম্পাদনা]এই চারটি প্রধান স্থানের পাশাপাশি আরও কিছু বৌদ্ধ তীর্থস্থান রয়েছে। যেমন রাজগৃহ, নালন্দা এবং সারণাথ সেসব সহজেই বৌদ্ধ সার্কিটের সঙ্গে ভ্রমণ করা যায়। বিখ্যাত হিন্দু তীর্থস্থান বারাণসীও এর অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
প্রবেশ
[সম্পাদনা]চারটি বৌদ্ধ স্থানের মধ্যে কেবল বোধগয়ার ১০ কিমি দূরত্বে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। 1 গয়া (গয়া আইএটিএ)। আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথসমূহ হলো:
চলাচল
[সম্পাদনা]এই সার্কিট আন্তর্জাতিক সড়ক ভ্রমণের অন্তর্ভুক্ত। পুরো রুটে জনপরিবহন খুব বেশি নেই।ফলে স্বাধীনভাবে এই সার্কিট সম্পন্ন করা কঠিন। বিভিন্ন ভ্রমণ সংস্থা ট্যুরের ব্যবস্থা করে থাকে। ভারতীয় রেলও একটি বিলাসবহুল ট্রেনে এই সার্কিট কভার করে।
সংগঠিত ভ্রমণ
[সম্পাদনা]বিলাসবহুল ট্রেন
[সম্পাদনা]ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ক্যাটারিং অ্যান্ড ট্যুরিজম কর্পোরেশন (আইআরসিটিসি) একটি সর্ব-সমেত বিলাসবহুল ট্রেনে বৌদ্ধ সার্কিটের ট্যুর পরিচালনা করে। এই বিলাসবহুল ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণির কামরা রয়েছে। এখানে দুটি ডাইনিং কার রয়েছে যা উন্নতমানের খাবারের অভিজ্ঞতা প্রদান করে। ট্যুরে ৫-তারা হোটেলে থাকার ব্যবস্থা ও খাবারও অন্তর্ভুক্ত। ৮ দিনের এই প্যাকেজটি দিল্লি থেকে শুরু হয় এবং একই স্থানে শেষ হয়।যার ভ্রমণসূচি নিম্নরূপ:
- দিন ১: দিল্লি, সাফদরজং স্টেশন থেকে গয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ট্রেনে রাতের খাবার পরিবেশন করা হয়।
- দিন ২: সকালে গয়া পৌঁছানো, গাড়িতে বোধগয়া যাত্রা, হোটেলে চেক-ইন ও মধ্যাহ্নভোজ। বিকেলে বোধগয়া দর্শন। রাতে বোধগয়ায় থাকা।
- দিন ৩: বোধগয়ার হোটেলে প্রাতঃরাশ। রাজগৃহ যাত্রা ও দর্শন, মধ্যাহ্নভোজ রাজগৃহে। বিকেলে নালন্দা দর্শন। রাতে বারাণসী যাত্রা।
- দিন ৪: সকালে সারণাথ দর্শন, মধ্যাহ্নভোজ হোটেলে। বিকেলে বারাণসী ভ্রমণ (নৌকাবিহার ও গঙ্গা আরতি)। রাতে হোটেলে রাতের খাবার। ট্রেনে করে নওতনওয়া যাত্রা ও লুম্বিনীর নিকটতম রেলস্টেশন।
- দিন ৫: সকালে লুম্বিনী পৌঁছে হোটেলে থাকা ও দর্শন।
- দিন ৬: সকালে কুশীনগর যাত্রা ও দর্শন, ট্রেনে ফিরে আসা।
- দিন ৭: শ্রাবস্তী ভ্রমণ, দর্শন শেষে ট্রেনে ফিরে আসা, রাতে আগ্রা যাত্রা।
- দিন ৮: সকালে তাজমহল দর্শন। দুপুরে ট্রেনে দুপুরের খাবার শেষে সাফদরজং স্টেশন, দিল্লিতে পৌঁছানো ।
খরচ: (২০২৪ সালের হিসেবে)
- শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রথম শ্রেণি: সমগ্র ট্যুর US$1400, প্রতিরাত $175
- শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দ্বিতীয় শ্রেণি: সমগ্র ট্যুর $1160, প্রতিরাত $145
যোগাযোগ: ফোন: +91 8287930157, ইমেইল: buddhisttrain@irctc.com
দর্শনীয় স্থান
[সম্পাদনা]প্রধান স্থান
[সম্পাদনা]


- 1 লুম্বিনী। লুম্বিনী, নেপাল হলো সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্মস্থান। যিনি পরবর্তীতে বুদ্ধ নামে পরিচিত হন। এটি ভারত-নেপাল সীমান্তে অবস্থিত। অশোক কর্তৃক স্থাপিত একটি স্তম্ভ বুদ্ধের জন্মস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে একটি বৌদ্ধ বিহার, শান্তি স্তূপ, জাদুঘর এবং লুম্বিনী আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
- 2 বোধগয়া। বুদ্ধ বোধগয়ায় একটি পিপল নামক গাছের নিচে জ্ঞানলাভ করেছিলেন। মূল গাছটি আর নেই। তবে তার একটি উত্তরসূরি গাছ আজও আছে। এটি বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীদের প্রধান আকর্ষণ। গাছটি বোধগয়ার প্রধান মন্দির কিছুটা ভেতরে অবস্থিত। অনেক স্থাপনা বুদ্ধের সময়কার এবং কিছু অশোকের রাজত্বকালে (২৬৮ – ২৩২ খ্রিস্টপূর্ব) নির্মিত। প্রধান মন্দিরটি পিরামিড আকৃতির যার উচ্চতায় ৫৫ ফুট। ইটের এই মন্দির গুপ্ত যুগের ৫ম–৬ষ্ঠ শতাব্দী খ্রিস্টাব্দের। বোধগয়ায় আরও একটি বিশাল বসা অবস্থায় বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে। এছাড়াও ভুটান, জাপান, থাইল্যান্ড ও তাইওয়ানের মতো বৌদ্ধ দেশগুলির নির্মিত বিভিন্ন মন্দির আছে। এখানে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর এবং মাল্টিমিডিয়া কেন্দ্রও রয়েছে।
- 3 সারণাথ। সারণাথ উত্তরপ্রদেশ, ভারত এর একটি ছোট গ্রাম। যা বারাণসী থেকে প্রায় ১৩ কিমি উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। এটি বিখ্যাত হরিণ উদ্যানের জন্য।যেখানে গৌতম বুদ্ধ প্রথম ধর্ম প্রচার করেন এবং যেখানে প্রাথমিক সংঘ গঠিত হয়। হরিণ উদ্যান কমপ্লেক্সের মধ্যে সম্রাট অশোক কর্তৃক ২৪৯ খ্রিস্টপূর্বে নির্মিত বৃহৎ ধামেখা স্তূপ রয়েছে। পাশাপাশি খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক থেকে খ্রিস্টীয় ১১শ শতক পর্যন্ত সময়ে নির্মিত অন্যান্য বহু বৌদ্ধ স্থাপত্যও রয়েছে।
- 4 কুশীনগর। এখানেই বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। এখানে তিনটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে— মাথা কুয়ার (শেষ উপদেশের স্থান), মহাপরিনির্বাণ (নির্বাণের স্থান) এবং রামভর স্তূপ (দাহক্রিয়ার স্থান)। চতুর্থ স্থানটি হলো ধাতু বিতরণ স্থান। যেখানে কোনও প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নেই। তবে একটি নবনির্মিত স্থান আছে। এখানে একটি জাদুঘর এবং কয়েকটি নতুন বৌদ্ধ মন্দিরও রয়েছে। যা বৌদ্ধ দেশগুলো নির্মাণ করেছে।
গৌণ স্থান
[সম্পাদনা]- 1 রাজগির।
- 2 নালন্দা।
- 3 শ্রাবস্তী।
- 4 বারাণসী।
- 5 কপিলবাস্তু।
- উদয়গিরি, ওড়িশা। উদয়গিরি একটি অনন্য ইউ আকৃতির উপত্যকায় অবস্থিত। যা পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত। এখানে বিস্তৃত একটি মহাবিহার কমপ্লেক্সের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। যা অসাধারণ বুদ্ধ মূর্তিতে সজ্জিত।
- রত্নগিরি। রত্নগিরি হলো খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দীর প্রাচীনতম বৌদ্ধ স্থান। বিখ্যাত চীনা ভ্রমণকারী হিউয়েন সাং উল্লেখ করেছিলেন যে, তিনি এখানে প্রায় ১০০টি বিহার দেখেছিলেন।
- ললিতগিরি। ললিতগিরি মনোরম পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত। যার সামনে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সুন্দর কেলু নদী। এখানে বিভিন্ন ভঙ্গিমার বুদ্ধ মূর্তি যেমন— অবলোকেশ্বর, মঞ্জুশ্রী, তারা— সহ টেরাকোটা সামগ্রী, তাম্র ফলক, সমৃদ্ধ ব্রোঞ্জ শিল্পকর্মও দেখা যায়।
