এই নিবন্ধের জন্য GPX ফাইল ডাউনলোড করুন

এশিয়া > দক্ষিণ এশিয়া > বাংলাদেশ > চট্টগ্রাম বিভাগ > কক্সবাজার জেলা > মহেশখালী উপজেলা > আদিনাথ মন্দির

আদিনাথ মন্দির

উইকিভ্রমণ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


আদিনাথ মন্দির বাংলাদেশের বিখ্যাত অন্যতম হিন্দু মন্দির। এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় শহর কক্সবাজার থেকে ১২ কিমি দূরের দ্বীপ মহেশখালীতে অবস্থিত। হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবতা দেবাদিদেব মহাদেবের নামানুসারে এ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মন্দিরটি শিব মন্দিরও নামেও বহুল প্রচলিত।

অবস্থান[সম্পাদনা]

কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার গোরকঘাটা ইউনিয়নের ঠাকুরতলা গ্রামে এই মন্দিরটি অবস্থিত, যা সমুদ্র-সমতল থেকে প্রায় ৮৫.৩ মিটার উঁচুতে। এই মন্দিরটি মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত, যা সমতল থেকে ৬৯টি সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়।[১][২] আদিনাথের অপর নাম মহেশ। এই মহেশের নামানুসারে মহেশখালী।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস[সম্পাদনা]

আদিনাথের গোড়াপত্তন কয়েক হাজার বৎসর পূর্বে ত্রেতাযুগে। এর একটি ঐতিহাসিক সত্যতা রয়েছে যা হিন্দু ধর্মগ্রন্থ, রামায়ণ, পুরাণ ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে জানা যায়। ত্রেতাযুগে রাম-রাবণের যুদ্ধের কথা ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায়। রাবণ লঙ্কা যুদ্ধে রামের সঙ্গে জয়লাভের জন্য দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে অমরত্ব বর প্রার্থনা করেন। মহাদেব এসময় কৈলাসে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। তিনি রাবণের আরধনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে অভীষ্ট সাধনে বর দান করেন এবং শর্ত দেন শিবরূপী উর্ধমুখী শিবলিঙ্গ কে কৈলাস হতে বহন করে লঙ্কায় নিয়ে যেতে হবে এবং পথিমধ্যে কোথাও রাখা যাবে না। যদি রাখা হয় তবে মহাদেব সেই স্থানেই অবস্থান নেবেন এবং রাবণের অভীষ্ট সাধন হবেনা। শর্তানুসারে রাবণ শিবলিঙ্গ বহন করে লঙ্কার উদ্দেশ্য গমন করেন তবে পথিমধ্যে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদনের লক্ষ্যে বর্তমান মহেশখালীর মৈনাক পর্বতে থামতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে শর্তানুসারে রাবণ শিবলিঙ্গ পূনরায় উঠাতে ব্যর্থ হন এবং মহাদেব এই মৈনাক শিখরেই অবস্থান গ্রহণ করেন।

শ্রী শ্রী আদিনাথ এর আবিস্কার সর্ম্পকে স্থানীয়ভাবে একটি জনশ্রুতি রয়েছে। এলাকাবাসীর মতানুসারে এই তীর্থ আবিস্কৃত এবং মর্যাদা পায় নূর মোহাম্মদ শিকদার নামক একজন সচ্ছল মুসলিম ধর্মালম্বীর মাধ্যমে। তিনি লক্ষ্য করেন তার একটি গাভী হঠাৎ দুগ্ধদান বন্ধ করে। এ ঘটনায় তিনি রাখালের উপর সন্ধিহান হন। রাখাল বিষয়টির কারণ অণুসন্ধানে রাত্রি বেলায় গোয়ালঘরে গাভীটিকে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেখতে পায় গাভীটি গোয়ালঘর হতে বের হয়ে একটি কাল পাথরের উপর দাড়ায় এবং গাভীর স্তন হতে আপনা আপনি ঐ পাথরে দুধ পড়তে থাকে। দুধ পড়া শেষ হলে গাভীটি পূনরায় গোয়ালঘরে চলে যায়। রাখাল বিষয়টি নূর মোহাম্মদ শিকদার কে জানালে তিনি গুরুত্ব না দিয়ে গাভীটি বড় মহেশখালী নামক স্থানে সরিয়ে রাখেন। একদিন শিকদার স্বপ্নাদেশ পান গাভীটিকে সরিয়ে রাখলেও তার দুধ দেওয়া বন্ধ হবে না বরং সেখানে তাকে একটি মন্দির নির্মাণ ও হিন্দু জমিদারদের পুজোদানের বিষয়ে বলতে হবে। স্বপ্নানুসারে শিকদার সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের মতানুসারে আদিনাথ মন্দিরই একমাত্র মন্দির যা, মুসলিম ধর্মালম্বী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত।

মৈনাক শিখরেই আদিনাথ মন্দিরের পাশে অষ্টাভূজারূপী দেবী দুর্গার একটি মন্দির রয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে নূর মোহাম্মদ শিকদারই অষ্টাভূজাকে সদূর নেপাল থেকে এখানে এনে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্নাদেশ পান। পরবর্তীতে নাগা সন্ন্যাসী নামক একজন সাধক ১৬১২ সালে নেপালের ষ্টেট মন্দির থেকে অষ্টাভূজাকে চুরি করে আনার সময় ধরা পড়ে জেলবণ্দি ও বিচারের সম্মুখীন হন। বিচারের পূর্ব রাত্রিতে সন্ন্যাসী যোগমায়াবলে মহাদেবের কৃপা সান্নিধ্য লাভ করেন। মহাদেব অভয় বাণী প্রদান করেন এবং বিচারকের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ইচ্ছামোতাবেক উত্তর দিতে বলেন। পরের দিন বিচারকালে বিচারক প্রথমে নেপালের রাজা এর নিকট মূর্তির রং জানতে চাইলে রাজা কষ্টি পাথরের মূর্তি কাল রং বলে বর্ননা দেন। একই প্রশ্ন সন্ন্যাসীকে করা হলে তিনি মূর্তির রং সাদা বলেন। পরবর্তীতে মূর্তি সকলের সম্মুখে উন্মোচন করে সাদা দেখা যায় এবং সন্ন্যাসীর পক্ষে রায় ঘোষণা করা হয়। রাজা প্রকৃত ঘটনা জানতে উদগ্রীব হলে সন্ন্যাসী তাকে বিস্তারিত বলেন। পরবর্তীতে রাজা যথাযথ মর্যাদার সহিত মৈনাক শিখরে শ্রী শ্রী আদিনাথ এর পাশে মন্দির নির্মাণ করে অষ্টভূজাকে প্রতিষ্ঠান করেন। মন্দির কমিটির তত্ত্বাবধায়কের মতে এখনও নেপাল সরকার মাঝে মধ্যে মন্দিরে যথাসাধ্য অণুদান দিয়ে থাকেন।

মূল আদিনাথ ও অষ্টাভূজা মন্দিরের পাশেই ভৈরব ও রাধা গোবিন্দ এর মন্দির রয়েছে।

যাতায়াত[সম্পাদনা]

কক্সবাজার জেলার কস্তুরী ঘাট অথবা ৬ নং ঘাট এলাকা হতে ট্রলার ও স্পিড বোর্ট যোগে মহেশখালী যাওয়া যায়। ট্রলারে প্রায় ১ ঘন্টা ও স্পিড বোর্টে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ট্রলার ও স্পিড বোর্ট পাওয়া যায়। এছাড়া কক্সবাজার জেলাধীন চকরিয়া উপজেলা সদর হতে ট্যাক্সি অথবা ব্যক্তিগত গাড়িযোগেও মহেশখালী যাওয়া যায়।

থাকার ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

মহেশখালীতে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে। হোটেল সি গার্ডেন ভালোমানের হোটেল। কক্সবাজার শহরের কলাতলীতেও ভালোমানের হোটেল আছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেল শৈবাল, লাবণী, প্রবাল ছাড়াও বেসরকারি হোটেলগুলোর মধ্যে হোটেল সী গাল, হোটেল সী প্যালেস, মিডিয়া ইন্টারন্যাশনাল, জিয়া গেস্ট হাউজ, সোহাগ গেস্ট হাউজ, গ্রীন অবকাশ রিসোর্ট, নিট বেল রেস্টহাউজ রয়েছে। এ সকল হোটেলে ৩০০ থেকে ৩০০০ টাকায় রাত্রিযাপন করা যায়।

খাওয়া দাওয়া[সম্পাদনা]

আদিনাথ মন্দির থেকে নেমে আসলেই জেলে পাড়া। জেলেদের জীবনযাপনের সাথে মেশার অপূর্ব সুযোগ রয়েছে। সমুদ্রের পাড়ে দেখা যায় বিচিত্র শামুক আর ঝিনুক। যে-কোন রেস্তোঁরায় কম দামে মজাদার রূপচাঁদা কিংবা কোরালের ন্যায় মজার মজার সামুদ্রিক মাছ খাবার ব্যবস্থা আছে। শুঁটকিও খাওয়া যায়।