উইকিভ্রমণ থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

চর কুকরি-মুকরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বাংলাদেশের একটি দর্শনীয় স্থান, যা ভোলা জেলার অন্তর্গত। এটি দেশের রাজধানী ঢাকা হতে ২২৫ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। বর্তমানে কুকরি মুকরি চরে বনভূমির পরিমাণ ৮৫৬৫ হেক্টর, যার মধ্যে ২১৭ হেক্টর জমি বন্য প্রাণীর অভয়াশ্রম।

বিশেষত্ব[সম্পাদনা]

চর কুকরি-মুকরি বাংলাদেশের অন্যতম সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বৃহৎ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার আওতাভূক্ত এই দ্বীপটি শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে। বঙ্গোপসাগরের উপকন্ঠে মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর মোহনায় কয়েকশ বছর আগে জেগে ওঠা দ্বীপ এটি। ঐতিহাসিকভাবে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয় ১৯১২ সালে এ চর জেগে উঠে। তৎকালীন জার্মান যুবরাজ প্রিন্স ব্রাউন জনমানবহীন এই চরে জাহাজ নিয়ে আসেন শিকারের উদ্দেশে। দেখতে পান একটি বিড়াল ও কুকুর ছোটাছুটি করছে। সেই দৃশ্যাবলী তাকে মনে করিয়ে দেয় নির্জন এই চরের নামকরণ। পরে জার্মানের অনূদিত রূপ হিসেবে বাংলায় যার নামকরণ হয়ে যায় চর কুকরি মুকরি। পর্তুগিজ ও ওলন্দাজরা দস্যুবৃত্তি লুটতরাজ করে এই চরে আশ্রয় নিত। এই দ্বীপকে প্রকৃতির রুদ্ররোষ থেকে রক্ষা করতে জেগে ওঠা চরগুলো সংরক্ষণে ১৯৪৭ সাল থেকে এখানে বনায়ন করা হয়। ওই কর্মসূচিই পরবর্তী সময়ে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্প হিসেবে রূপলাভ করে।

এক সময় এই চরে শুধু কুকুর আর ইঁদুর (স্থানীয়দের কাছে যা মেকুর নামে পরিচিত) ছাড়া আর তেমন কিছুই চোখে পড়তো না। চর কুকরি মুকরির বনে যেসব প্রাণী দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে চিত্রা হরিণ, বানর, উদবিড়াল, শিয়াল প্রভৃতি। আর পাখি ও সরীসৃপ হিসেবে এই বনে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বক, বনমোরগ, শঙ্খচিল, মথুরা, কাঠময়ূর, কোয়েল, গুঁইসাপ, বেজি, কচ্ছপ ও নানা ধরনের সাপ। শীতকালে দেখা মিলে হাজার হাজার অতিথি পাখির ৷

১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে চর কুকরি মুকরি এলাকায় প্রশাসনিক উদ্যোগে বনায়নের কাজ শুরু হয়। এই সময় মূলত শ্বাসমূলীয় গাছের চারা রোপণ করে বনায়ন শুরু করা হলেও পরে ক্রমে ক্রমে যুক্ত হয় সুন্দরী, গেওয়া, পশুর প্রভৃতি গাছের চারা রোপণ করা। এছাড়া গোটা এলাকায়ই চোখে পড়ে বিপুলসংখ্যক কেওড়া গাছ। মূলত বিশাল এলাকায় গড়ে ওঠা এসব গাছ, আশপাশের নারিকেল গাছ, বাঁশ ও বেত বন মিলেই এখানেই তৈরি হয়েছে আকর্ষণীয় একটি ম্যানগ্রোভ শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল।

কীভাবে যাবেন[সম্পাদনা]

রাজধানী ঢাকা থেকে চরফ্যাশন উপজেলার দূরত্ব ২২৫ কিলোমিটার এবং জেলা সদর ভোলা থেকে দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। ভোলা জেলাটি একটি দ্বীপাঞ্চল হওয়ায় এখানকার যেকোনো স্থানে আসার জন্য নৌপথ সবচেয়ে সুবিধাজনক পরিবহন ব্যবস্থা। তবে, সড়ক পথেও এখানে আসা সম্ভব; সেক্ষেত্রে ফেরী পারাপার হতে হবে। তবে, রেল এবং বিমান পথে এখানে সরাসরি পৌছানোর কোনো সুযোগ এখনও গড়ে ওঠেনি।

ঢাকার গুলিস্তান/যাত্রাবাড়ি/ফার্মগেইট জাতীয় মহাসড়কে হয়ে লক্ষ্মীপুর এসে মজুচৌধুরীর হাট হয়ে চরফ্যাশন বা ঢাকা থেকে মাওয়া ফেরিঘাট হয়ে বরিশাল এসে সেখান থেকে স্প্রীড বোর্ড অথবা লঞ্চ অথাব বাস যোগে চরফ্যাশন উপজেলা।

ঢাকা সদরঘাট থেকে লঞ্চে সরাসরি চরফ্যাশনের বেতুয়া বা ঘোষেরহাট লঞ্চঘাট আসা যায়; এতে সময় লাগে প্রায় ৮ ঘণ্টা। আবার, ঢাকা সদরঘাট থেকে লঞ্চ যোগে ভোলায় এসে সেখান থেকে নৌপথে বা সড়ক পথে চরফ্যাশন আসা যায়।

ঘুরে দেখুন[সম্পাদনা]

নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে বেড়াতে পারেন; এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো -

  1. তারুয়া সমুদ্র সৈকত - জেলা সদর থেকে দেড়শ কিলোমিটার দূরে তারুয়া সমুদ্র সৈকতের অবস্থান; একশত পয়ত্রিশ কিলোমিটার পাকা সড়কের পর পনের কিলোমিটার নৌ-পথ পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়।
  2. জ্যাকব ওয়াচ টাওয়ার - ভোলা জেলা শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেঁষে ওয়াচ টাওয়ারটি অবস্থিত।
  3. বেতুয়া সমুদ্র সৈকত;
  4. ফ্যাশন স্কয়ার;
  5. চরফ্যাশন শিশু পার্ক।

কোথায় থাকবেন[সম্পাদনা]

চরফ্যাশনে থাকার জন্য স্থানীয় পর্যায়ের কিছু সাধারণ মানের হোটেল রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকার জন্যে রয়েছে উন্নতমানের -

  1. জেলা পরিষদ ডাকবাংলো - চরফ্যাশন।

চর কুকরি মুকরিতে ২টি আবাসিক হোটেল ও একটি আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট এর ব্যবস্থা রয়েছে। তা ছাড়া থাকার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে উঠতে পারেন। সেখানকার চেয়ারম্যান বা তার সেক্রেটারির সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। এছাড়া বাজারে যে দুইটি খাবারের হোটেল আছে তাদের বললেও কোন বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিবে ৷

তবে সবচেয়ে সহজ আর মজাদার থাকার ব্যবস্থা হলো চরে ক্যাম্প করে থাকা। এতে খরচ যেমন বাঁচবে, সাথে পাবেন প্রাকৃতিক এক অন্যরকম ভিন্ন পরিবেশ। এই চরের যেখানে খুশি ক্যাম্প করতে পারেন, সম্পূর্ণ নিরাপদ। ক্যাম্প করার জন্য এখানে আছে, বিশাল জায়গা। আপনি যেখানে ইচ্ছা ক্যাম্প করতে পারবেন। তবে বনের ভিতরে ক্যাম্প করা থেকে বিরত থাকবেন। বনের পাশে বিশাল বালুর চর যেখানে ইচ্ছে ক্যাম্প করতে পারেন।

মূল চরের আগে একটি খাল আছে তা পার হয়ে ৩০০-৪০০ মিটার সামনের কিছু জায়গা আছে বনের পাশে গাছের ছায়ায় সেখানে ক্যাম্প করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই স্থানীয় কারো কাছে জোয়ারের পানি কতদূর পর্যন্ত আসে তা জেনে নিবেন। এখন পর্যন্ত যারা ব্যাকপ্যাকিং করেছেন তারা সবাই এখানেই ক্যাম্প করেছিলেন। এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের মাঠেও ক্যাম্প করতে পারেন। সাইক্লোন শেল্টার ও দুটি এনজিওর অফিস আছে - সেখানেও থাকতে পারবেন।

খাওয়া দাওয়া[সম্পাদনা]

চরফ্যাশনে খাবারের জন্য বেশ কিছু স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ

  • খাবার ঘর;
  • আনন্দ রেস্তোরা;
  • বনফুল এন্ড কোং।

চর কুকরি মুকরি বাজারে তেমন ভালো কোনো খাবারের ব্যবস্থা নেই। স্থানীয়দের হাতের রান্না করা খাবার পাবেন হোটেলগুলোতে। সম্ভব হলে বাজার থেকে তাজা মাছ কিনে রাঁধতে দিন, দামে সস্তা আর স্বাদেও টাটকা। কুকরি মুকরি বাজারে দুটি খাবার হোটেল আছে, একটি হোটেল হানিফ অন্যটি নিমাই হোটেল। অর্ডার দিলে আপনার মন মত মেনু রেডি করে দিবে। ব্যাকপ্যাকিং করেও নিজেরা রান্না করে খেতে পারবেন ৷ এই চরে লাকড়ির অভাব নেই ৷

যেখানে ক্যাম্প করবেন তার আশেপাশে ১০-২০ মিটার হাঁটলেই তিন চারদিনের লাকড়ি যোগাড় হয়ে যাবে। যদি ব্যাক-প্যাকিংয়ে নিজেরা রান্না করে খেতে না চাইলে হোটেলে বলে দিতে পারেন, রান্না করে আপনার কাছে পৌঁছে দিবে। তাছাড়া স্থানীয় অনেক লোক আছে যারা ব্যাকপ্যাকারদের জন্য খাবার ব্যবস্থা করে থাকে।

আর বাজার থেকে ড্রাম ভাড়া নিয়ে মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করতে পারবেন। নদীর পানি লবণাক্ত তাই পান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। শুধু পান করা ছাড়া ভুলেও মিষ্টি পানি খরচ করবেন না, কারণ প্রায় ৩ কি.মি. হেঁটে আপনাকে এই পানি সংগ্রহ করতে হবে, না হয় জোয়ার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে যা অনেক সময় সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য।

  • খাবারের হোটেলঃ হোটেল হানিফ (আবাসিক):০১৭১৫৯১১১৩৬

সতর্কতা[সম্পাদনা]

  • যেহেতু চর এলাকা তাই গাড়ির কোন ব্যবস্থা নাই, যাদের হাঁটার অভ্যাস নাই বা অনিহা তারা না যাওয়াই ভালো।
  • বনের ভিতরে ক্যাম্প করা থেকে বিরত থাকুন।
  • বনের বেশি গহীনে যাবেন না, আর গেলেও অন্তত দু জন নিয়ে যাবেন যেন পথ হারিয়ে না ফেলেন।
  • যেহেতু বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য, তাই তাদের চলার পথে বাধার সৃষ্টি করবেন না বা প্রাণীকে ভয় দেখাবেন না।
  • শিয়ালের উৎপাত বেশ ভালোই এই চরে তাই রাতে তাবু থেকে নিরাপদ দূরত্বে ক্যাম্প ফায়ার করবেন অবশ্যই।
  • হরিণ শিকার থেকে বিরত থাকবেন, ইহা দণ্ডনীয় অপরাধ।
  • সরীসৃপ প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে অতিরিক্ত সতর্কতাস্বরূপ ক্যাম্প গ্রাউন্ডের চারিপাশে কার্বলিক এসিড ছিটিয়ে দিন।
  • প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেয়ে বন নোংড়া থেকে বিরত থাকবেন। এমন ভাবে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিন যেন কোন চিহ্ন না থাকে।
  • খাবার দাবারের ঝুটা নদীতে বা বালুতে গর্ত করে পুতে দিন। আর সকল প্রকার পলি প্যাকেট ব্যাগে ভরে নিয়ে আসুন, চর নোংরা করবেন না।
  • প্রকৃতির ওপড় কোন খারাপ প্রভাব পড়ে এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন।
  • হৈ হুল্লোর, চিল্লাচিল্লি থেকে বিরত থাকুন। খালি পায়ে বনের ভিতর হাঁটবেন না।
  • যে জায়গায় ক্যাম্প করবেন ফিরে আসার আগে সে জায়গা এমন ভাবেই রেখে আসুন যেভাবে ক্যাম্প করার আগে পেয়েছিলেন, যেন কেউ না বুঝতে পারে এখানে কেউ বা কারা এসে দুই এক রাত থেকে ছিলো।
  • এই অঞ্চলে বিদ্যুতের কোন ব্যবস্থা নেই, তাই অবশ্যই পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখুন। আর বাজারে সোলার পাবেন সেখানেও মোবাইল চার্জ করতে পারেন যা অনেক সময়সাপেক্ষ।
  • স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন, তাদের অমায়িক ব্যবহারে আপনি নিজেও মুগ্ধ হবেন।
  • যে কোন সমস্যায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে যোগাযোগ করুন, খুবই ভালো আর অমায়িক একজন মানুষ। বিশেষ করে টুরিস্টদের জন্য বেশ হেল্পফুল একজন মানুষ।
  • নদীতে গোসলে সতর্কতা অবলম্বন করুন, সাতার না জানলে বেশি দূর যাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
  • গ্রামীনফোন ও রবির নেটওয়ার্ক পাবেন এই চরে তাই এরকম অপারেটর এর সিম সচল রাখুন।

যেকোনো সমস্যায় যোগাযোগ করতে পারেন -

জননিরাপত্তা সম্পর্কিত যোগাযোগের জন্য
  • উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা, চরফ্যাশনঃ মোবাইল: ০১৭১১-৫৭৪ ২০২;
  • উপজেলা নির্বাহী অফিসার, চরফ্যাশনঃ ০৪৯২৩-৭৪০৩০; মোবাইল: ০১৭৪০-৯২০ ২৪৬;
  • ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবের সেক্রেটারি মোঃ জাকির, মোবাইল: ০১৭৯৯৬৬৯৪১।

বিষয়শ্রেণী তৈরি করুন