দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হল ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত কয়েকটি বৈচিত্র্যময় গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশের সমষ্টি। এখানকার সংস্কৃতি ভারত ও চীন উভয় দ্বারাই প্রভাবিত এবং এখানে প্রবাসী চীনাদের বিশাল জনগোষ্ঠী বসবাস করে। এই অঞ্চলে বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ দেশ এবং বেশ উল্লেখযোগ্য খ্রিস্টান, হিন্দু ও সর্বপ্রাণবাদী সম্প্রদায়ও রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ব ভ্রমণকারী ব্যাকপ্যাকারদের কাছে একটি প্রিয় জায়গা, যা তার নিখুঁত সৈকত, সুস্বাদু খাবার, কম দাম এবং ভালো বিমান যোগাযোগের জন্য পরিচিত।
দেশসমূহ
[সম্পাদনা]| ব্রুনাই বোর্নিওতে অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র, তেল-সমৃদ্ধ সালতানাত। এই দেশটির মধ্যে পর্যটকরা তেমন একটা আসেন না। তবে এখানে শান্ত পরিবেশের মসজিদ রয়েছে। আছে নানা সাংস্কৃতিক স্থান, যেগুলো এখনো গণ-পর্যটনের ভিড়ে বাণিজ্যিক হয়ে ওঠেনি। |
| কম্বোডিয়া এখানে আংকরের প্রাচীন শহর অবস্থিত। একদা শক্তিশালী খ্মের সাম্রাজ্যের অন্যান্য ধ্বংসাবশেষও এখানে দেখা যায়। দশকের পর দশক ধরে চলা যুদ্ধের প্রভাব থেকে দেশটি এখনও বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। |
| পূর্ব তিমুর বিশ্বের নবীনতম রাষ্ট্রগুলির মধ্যে একটি, তিমুর দ্বীপের পূর্বাংশে অবস্থিত একটি প্রাক্তন পর্তুগিজ উপনিবেশ, যা চমৎকার ডাইভিং এবং এই অঞ্চলের এক অনন্য সংস্কৃতির জন্য সুপরিচিত |
| ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপপুঞ্জীয় রাষ্ট্র যেখানে ১৬,০০০-এরও বেশি দ্বীপ রয়েছে এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, তবে নামমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ এবং হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত |
| লাওস এই অঞ্চলের একমাত্র স্থলবেষ্টিত এবং সবচেয়ে কম জনবহুল দেশ, প্রধানত বৌদ্ধধর্মাবলম্বী লাওসে চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং মনোরম শান্ত শহর রয়েছে |
| মালয়েশিয়া এটি একটি বহুসাংস্কৃতিক দেশ। এখানে মুসলিম মালয়, প্রধানত বৌদ্ধ চীনা, এবং প্রধানত হিন্দু ভারতীয়রা বাস করে। এছাড়াও এখানে ওরাং আসলি সহ অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে, বিশেষ করে বোর্নিওতে। এই দেশের বিস্তার কুয়ালালামপুরের আকাশচুম্বী ভবন থেকে শুরু করে বোর্নিওর জঙ্গলবাসী উপজাতি পর্যন্ত। |
| মিয়ানমার এটি অকল্পনীয় জাতিগত বৈচিত্র্য সহ একটি প্রাচীন দেশ। এর ইতিহাসে একটি দেশীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ হওয়া, উভয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, দেশটি সামরিক অভ্যুত্থান, গণতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠী এবং কয়েক ডজন জাতিগত বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর মধ্যে এক কখনও শেষ না হওয়া সংঘাতে জড়িত। |
| ফিলিপাইন এখানে এশীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ দেখা যায়। সংঘর্ষ এড়িয়ে চলা এবং গুরুজনদের প্রতি সম্মানের মতো ঐতিহ্যের সাথে স্প্যানিশ ধারণা মিশে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ম্যাচিসমো, রোমান্স এবং পরিশীলিততার মতো স্প্যানিশ ধারণা। এর সাথে আধুনিক মার্কিনীকরণের প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। এটি এই অঞ্চলের বৃহত্তম খ্রিস্টান রাষ্ট্র। এটি ৭,৬৪১টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপপুঞ্জ। এর বেশিরভাগ দ্বীপেই সুন্দর গ্রীষ্মমন্ডলীয় সৈকত রয়েছে এবং এখানকার মানুষের মধ্যে উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি দেখা যায়। |
| সিঙ্গাপুর সমৃদ্ধ, পরিচ্ছন্ন এবং সুশৃঙ্খল দ্বীপ-শহর-রাষ্ট্র, যেখানে চীনা সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও শক্তিশালী মালয় ও ভারতীয় সংখ্যালঘু এবং ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক প্রভাব রয়েছে, এটি এই অঞ্চলের প্রধান ব্যবসা ও আর্থিক কেন্দ্র |
| থাইল্যান্ড এটি এই অঞ্চলের একমাত্র দেশ যা পশ্চিমা উপনিবেশবাদ এড়াতে পেরেছিল। দেশটি তার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং রন্ধনশৈলীর জন্য পরিচিত। এখানে ব্যস্ত ও প্রাণচঞ্চল শহর, শান্ত সৈকত এবং বৌদ্ধ রাজ্যগুলির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এই সমস্ত কারণে এটি এই অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে এবং পর্যটকরা এখানে বারবার ফিরে আসেন। |
| ভিয়েতনাম বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি হিসাবে পুঁজিবাদের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলেছে, ভিয়েতনামে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ও চীনা মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির মিশ্রণ রয়েছে, সাথে এর ফরাসি ঔপনিবেশিক অতীতের প্রভাব এবং প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণের বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে |
ক্রিসমাস দ্বীপ এবং কোকোস (কিলিং) দ্বীপপুঞ্জ দুটিই অস্ট্রেলীয় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অংশ। এগুলি ভৌগোলিকভাবে এবং সাংস্কৃতিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে যুক্ত। তবে, যেহেতু এগুলি অস্ট্রেলিয়ার অধীন, তাই এগুলিকে অস্ট্রেলিয়ার অধীনে আলোচনা করা হয়েছে।
দক্ষিণ চীন এবং তাইওয়ানের কিছু অংশে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দ্বারা প্রভাবিত, কিন্তু উইকিভ্রমণে এগুলিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই অঞ্চলের বিতর্কিত অঞ্চলগুলি হল:
- প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জ – এটি চীনের দ্বারা শাসিত, তবে ভিয়েতনাম এবং তাইওয়ানও এর মালিকানা দাবি করে। বিদেশী পর্যটকদের জন্য এখানে প্রবেশাধিকার নেই।
- স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জ – এটি মূলত জনবসতিহীন দ্বীপ ও প্রবাল প্রাচীরের একটি সমষ্টি এবং এটি এক জটিল আঞ্চলিক বিরোধের অধীন। এখানকার একমাত্র উল্লেখযোগ্য গন্তব্য হল ডাইভ রিসোর্ট লায়াং লায়াং, যা মালয়েশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পূর্ব তিমুর ছাড়া, উপরে তালিকাভুক্ত অন্য দশটি দেশ আসিয়ানের (অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস) সদস্য। পূর্ব তিমুর আসিয়ানের একজন পর্যবেক্ষক এবং পূর্ণ সদস্যপদ লাভের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পাপুয়া নিউগিনিও একজন পর্যবেক্ষক, কিন্তু এটিকে তেমনভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশ হিসাবে বিবেচনা করা হয় না।
শহরসমূহ
[সম্পাদনা]দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নয়টি প্রধান শহরের মধ্যে রয়েছে:

- 1 ব্যাংকক — বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন শহর, থাইল্যান্ডের রাজধানী। মন্দির, খাবার, বাজার এবং নৈশ জীবনের জন্য বিখ্যাত।
- 2 হো চি মিন সিটি (আগে সাইগন নামে পরিচিত) — ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় শহর, যা দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে অবস্থিত।
- 3 জাকার্তা — বিস্তৃত, ভিড়ভাট্টায় ভরা ও প্রাণবন্ত ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় শহর।
- 4 কুয়ালালামপুর — মালয়েশিয়ার রাজধানী। একটি ছোট ঘুমন্ত চীনা টিন খনির গ্রাম থেকে বেড়ে আজ এক ব্যস্ত মহানগরে পরিণত হয়েছে।
- 5 লুয়াং প্রাবাং — লাওসে অবস্থিত একটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য শহর, যা অসংখ্য মন্দির, ঔপনিবেশিক যুগের স্থাপত্য এবং প্রাণবন্ত রাতের বাজারের জন্য পরিচিত।
- 6 ম্যানিলা — ফিলিপাইনের বিশাল রাজধানী। এখানে স্পেনীয় ঔপনিবেশিক যুগের নিদর্শন থেকে শুরু করে আকাশচুম্বী ভবন পর্যন্ত রয়েছে।
- 7 নমপেন — কম্বোডিয়ার রাজধানী। খেমার রুজ আমলে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, আজ আবার “এশিয়ার মুক্তো” খেতাব ফিরে পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে।
- 8 সিঙ্গাপুর — অতি আধুনিক, ঘনবসতিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ শহর। চীনা, ভারতীয়, মালয় এবং ব্রিটিশ প্রভাবের মিশ্রণ রয়েছে এখানে।
- 9 ইয়াঙ্গুন (আগে রেঙ্গুন নামে পরিচিত) — মিয়ানমারের বাণিজ্যিক রাজধানী। প্যাগোডা ও ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত।
অন্যান্য গন্তব্য
[সম্পাদনা]প্রধান শহরগুলির বাইরে এখানকার কয়েকটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য হল:
- 10 আঙ্কোর প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যান — খ্মের সাম্রাজ্যের বিভিন্ন রাজধানীর চমৎকার ধ্বংসাবশেষ
- 11 বালি — "দেবতাদের দ্বীপ" নামে পরিচিত, অনন্য হিন্দু সংস্কৃতি, সৈকত এবং পর্বতমালার জন্য বিখ্যাত
- 12 বরোবুদুর — বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বৌদ্ধ মন্দির
- 13 গুনুং মুলু জাতীয় উদ্যান — চমৎকার চুনাপাথরের গুহা এবং কার্স্ট ভূমিরূপ
- 14 হা লং উপসাগর — আক্ষরিক অর্থে "ড্রাগন অবতরণের উপসাগর", যা তার মনোরম শিলা গঠনের জন্য বিখ্যাত
- 15 কমোডো জাতীয় উদ্যান — বিশ্বের বৃহত্তম সরীসৃপ কোমোডো ড্রাগনের একমাত্র আবাসস্থল
- 16 ক্রাবি প্রদেশ — সৈকত এবং জলক্রীড়ার কেন্দ্র, এর মধ্যে রয়েছে আও নাং, রাই লে, কো ফি ফি এবং কো লান্তা
- 17 পালাওয়ান — ফিলিপাইনের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত একটি পরিবেশগতভাবে বৈচিত্র্যময় এবং তুলনামূলকভাবে নির্জন দ্বীপ, যেখানে বিশ্বের সেরা কিছু ডাইভিং এবং সাঁতারের স্থান রয়েছে
- 18 প্রিয় বিহার মন্দির — এটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি মন্দির যা আংকর ওয়াটের চেয়েও পুরনো।
জানুন
[সম্পাদনা]দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র, এবং এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে। এখানকার কিছু দেশে সবকিছুই রয়েছে: সারা বছর ধরে উষ্ণ (বা গরম!) গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ু, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, চমৎকার সৈকত, অপূর্ব খাবার এবং সর্বোপরি, সবকিছুরই কম দাম। যদিও এর ইতিহাস এবং আধুনিক রাজনীতি বেশ জটিল, এখানকার বেশিরভাগ এলাকাই বেশ নিরাপদ এবং ভ্রমণের জন্য সহজ।
এই অঞ্চলটি বিদেশে অবসরযাপনের জন্যও একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশের সরকার অবসরপ্রাপ্তদের জন্য বিশেষভাবে বিশেষ দীর্ঘমেয়াদী ভিসা প্রদান করে।
ইতিহাস
[সম্পাদনা]

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। এখানে বিভিন্ন উৎসের অসংখ্য জাতিগোষ্ঠী রয়েছে।
প্রাগৈতিহাসিক কালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জনবসতি খুব কম ছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম জনবসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠী ছিল অস্ট্রো-এশীয় জনগণ। ধারণা করা হয় যে তাদের উদ্ভব হয়েছিল বর্তমান দক্ষিণ চীনে। তাদেরকেই আজকের ভিয়েতনামী, খ্মের এবং মোন জনগণের পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়। পরবর্তীতে অন্যান্য গোষ্ঠীর আগমন ঘটে। এর মধ্যে ছিল তাই জনগণ, যাদেরকে আজকের থাই, লাও এবং শান জনগণের পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়। আরও ছিল চীন-তিব্বতি জনগণ, যাদেরকে আজকের বামার এবং রাখাইন জনগণের পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়, এবং মং জনগণ। মালয় দ্বীপপুঞ্জ এবং মালয় উপদ্বীপে প্রধানত অস্ট্রোনেশীয় জনগণ বাস করত। ধারণা করা হয় যে তাদের উৎস ছিল তাইওয়ানের আদিবাসী জনগণ।
প্রথম শতাব্দী থেকে বিভিন্ন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জনগণের মধ্যে ভারতীয় প্রভাব বাড়তে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াটি ভারতীয়করণ নামে পরিচিত। এটি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে, সবচেয়ে জনপ্রিয় তত্ত্বটি হল ভারত থেকে বণিকদের জাহাজ বা ক্যারাভানে ভ্রমণকারী ব্রাহ্মণরা তাদের সাথে হিন্দুধর্ম এবং পরে বৌদ্ধধর্ম নিয়ে আসেন। তারা প্রথমে অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে এই ধর্মগুলি ছড়িয়ে দেন। সেখান থেকে তা ধীরে ধীরে বাকি জনসংখ্যার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক থাই, লাও, বর্মী এবং খ্মের ভাষা লেখার জন্য এখনও যে ভারতীয় লিপি ব্যবহার করা হয়, তার মূল এই প্রক্রিয়াতেই নিহিত। এই ভাষাগুলি ছাড়াও জাভানিজ, বালিনিজ, মালয় এবং চামের মতো অন্যান্য ভাষাও সংস্কৃত থেকে অনেক শব্দ গ্রহণ করেছিল। এই জাতিগুলির মধ্যে অনেকেই অবশেষে শক্তিশালী ভারতীয়কৃত রাজ্য তৈরি করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে খ্মের সাম্রাজ্য, চম্পা, ফুনান, বাগান সাম্রাজ্য, সুখোথাই রাজ্য, শ্রীবিজয়া এবং মজাপহিত। বর্তমানে, হিন্দুধর্ম মূলত ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপেই সীমাবদ্ধ। তবে, হিন্দু উৎসের অনেক ঐতিহ্য এবং গল্প সমগ্র অঞ্চল জুড়ে টিকে আছে। এমনকি বৌদ্ধ, মুসলিম বা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী জনগণের মধ্যেও এগুলি দেখা যায়। অন্যদিকে, থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম থাইল্যান্ড, মায়ানমার, কম্বোডিয়া এবং লাওসের প্রধান ধর্ম। যদিও এটি এখনও বিভিন্ন মাত্রায় হিন্দুধর্ম এবং স্থানীয় লোকধর্মের সাথে সমন্বিত।
অন্যদিকে, ভিয়েতনাম চীনের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। কারণ এটি চীনা হান, তাং এবং মিং রাজবংশ দ্বারা অধিকৃত ছিল। যদিও ভিয়েতনামীরা প্রত্যেকবার চীনাদের বিতাড়িত করতে সফল হয়েছিল, চীনারা ভিয়েতনামী সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ভিয়েতনামী সামাজিক শিষ্টাচার গঠনে কনফুসীয়বাদ এবং তাওবাদ অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। অনেক ভিয়েতনামী রাজবংশ চীনের আমলাতন্ত্র ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। মহাযান বৌদ্ধধর্মও চীনের মাধ্যমে ভিয়েতনামে প্রবেশ করেছিল। যদিও আজকের সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী বেশিরভাগ ভিয়েতনামী অধার্মিক, তবুও তাদের অনেকেই বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস পালন করে। বেশিরভাগ ভিয়েতনামী এখনও কমবেশি তাওবাদ, কনফুসীয়বাদ, মহাযান বৌদ্ধধর্ম এবং ভিয়েতনামী লোকধর্মের এক সমন্বিত মিশ্রণ চর্চা করে। ভিয়েতনাম ভিয়েতনামী ভাষা লেখার জন্য চীনা অক্ষরও গ্রহণ করেছিল। তবে, ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে এটি ল্যাটিন বর্ণমালা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল।
৭ম শতাব্দীতে আরব বণিকদের সাথে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে। ১২শ শতাব্দী থেকে এটি মালয় দ্বীপপুঞ্জের বেশিরভাগ অংশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মালাক্কা সুলতানি প্রাথমিকভাবে একটি হিন্দু রাজ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ১৫শ শতাব্দীতে এটি ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। এর ফলে এটি এই অঞ্চলের প্রথম শক্তিশালী মুসলিম রাজ্যে পরিণত হয় এবং ইসলাম মালয় দ্বীপপুঞ্জের প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। মালয় ভাষা লেখার জন্য আরবি লিপিও গৃহীত হয়েছিল। তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে এটি মূলত ল্যাটিন বর্ণমালা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। আরবি লিপি এখনও ব্রুনাইয়ে সরকারিভাবে স্বীকৃত। মালয়েশিয়ার তেরেঙ্গানু এবং কেলান্তানের মতো আরও রক্ষণশীল রাজ্যগুলিতে কিছু মানুষ এটি ব্যবহার করে। তবে ধর্মীয় প্রকাশনা ছাড়া উভয় দেশেই ল্যাটিন বর্ণমালার তুলনায় এর ব্যবহার অনেক কম।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও প্রায়শই উত্তাল, এবং এটি বহুলাংশে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতাবাদ দ্বারা প্রভাবিত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নামটিই ১৯৪০ সালের দিকে আমেরিকান নৌ কৌশলবিদরা উদ্ভাবন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে এর ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর নামে উল্লেখ করা হতো। যেমন, প্রধান ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতের প্রসঙ্গে বার্মা এবং থাইল্যান্ডকে বৃহত্তর ভারত বলা হতো, যদিও থাইল্যান্ড নিজে কখনও উপনিবেশে পরিণত হয়নি। একইভাবে, ইন্দোচীন বলতে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং লাওসের ফরাসি উপনিবেশগুলিকে বোঝানো হতো, আর ইন্দোনেশিয়া ও সামুদ্রিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশকে বলা হতো ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ। উপদ্বীপীয় মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর ব্রিটিশ মালয় নামে পরিচিত ছিল, আর সাবাহ পরিচিত ছিল ব্রিটিশ উত্তর বোর্নিও নামে। অন্যদিকে, সারাওয়াক ছিল সারাওয়াক রাজ্য, যা শ্বেত রাজা নামে পরিচিত এক ব্রিটিশ পরিবার শাসন করত। ব্রুনাইকেও একটি ব্রিটিশ আশ্রিত রাজ্যে পরিণত করা হয়েছিল, যার প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ের দায়িত্ব নেয় ব্রিটিশরা। স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শুরুতে ফিলিপাইনের নাম ছিল স্প্যানিশ ইস্ট ইন্ডিজ। পরে স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের সম্মানে এর বর্তমান নামকরণ করা হয়, এবং দ্বীপপুঞ্জটি স্প্যানিশদের হাত থেকে আমেরিকানদের অধীনে যাওয়ার পরেও এই নামটিই রয়ে যায়। পূর্ব তিমুর ২৭৩ বছর পর্তুগালের উপনিবেশ থাকার পর ২৭ বছর ইন্দোনেশিয়ার অধীনে ছিল এবং অবশেষে একবিংশ শতাব্দীতে প্রথম স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ব্যাপক ঔপনিবেশিকতার পিছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল লাভজনক মশলার ব্যবসা। এর ফলে জায়ফল, রাবার এবং চায়ের মতো বাগিচা ফসল ফলানো ও বিক্রির জন্য প্রচুর শ্রমিকের অভিবাসন ঘটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য ছিল এক বিরাট বিপর্যয় (বিস্তারিত জানতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধ দেখুন), এবং এটি পশ্চিমা উপনিবেশবাদের অবসানের সূচনাও করেছিল, কারণ পশ্চিমা শক্তিগুলো একে একে লজ্জাজনকভাবে জাপানের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ১৯৪২ সালের শেষের দিকে জাপানিরা প্রায় সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জয় করে নেয়। শুধুমাত্র থাইল্যান্ডই অপরাজিত ছিল, কারণ থাইরা জাপানিদের সাথে একটি বন্ধুত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির ফলে জাপানিরা থাইল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং তাদের সৈন্যদের থাইল্যান্ডের মধ্য দিয়ে অবাধে যাতায়াতের অনুমতি পায়। জাপানি দখলদারিত্বের সময়টা অনেক স্থানীয়দের জন্য বিরাট কষ্টের ছিল, কারণ জাপানিরা সমস্ত সম্পদ নিজেদের জন্য নিয়ে নিত এবং নিজেদের লাভের জন্য স্থানীয়দের শোষণ করত, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি দাস বানিয়ে নিত। দখলকৃত জনগণের প্রতি, বিশেষ করে জাতিগত চীনাদের প্রতি, তারা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তির চেয়েও অনেক বেশি নৃশংস ছিল। তবে জাপানি দখলদারিত্ব অনেক স্থানীয়কে এই বিশ্বাস জুগিয়েছিল যে পশ্চিমা শক্তিগুলো অপরাজেয় নয়। এর ফলেই যুদ্ধের পর স্বাধীনতা আন্দোলনগুলো আরও গতি পায়।
যুদ্ধের পর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উপনিবেশ বিলোপ প্রক্রিয়া শুরু হয়, যেখানে মার্ক্কিনরা ১৯৪৬ সালে ফিলিপাইনকে স্বাধীনতা দেয়, অন্যদিকে ব্রিটিশরা ১৯৪৮ সালে বার্মাকে স্বাধীনতা দেয়, এরপর ১৯৫৭ সালে মালয়কে এবং অবশেষে ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর, সারাওয়াক এবং উত্তর বোর্নিওকে স্বাধীনতা দেয়, যারা মালয়ের সাথে যুক্ত হয়ে মালয়েশিয়া গঠন করে। কিছু আদর্শগত সংঘাতের পর, ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুরকে মালয়েশিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ব্রিটিশ এবং আমেরিকানদের তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাহারের বিপরীতে, ওলন্দাজ এবং ফরাসিরা তাদের উপনিবেশ ধরে রাখার প্রয়াসে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছিল এবং অপমানজনক পরাজয় বরণ করেছিল। ইন্দোনেশিয়া ১৯৪৯ সালে ওলন্দাজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, এবং ইন্দোচীন ফরাসি সামরিক বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে এবং ১৯৫৪ সালে লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম দেশে বিভক্ত হয়ে যায়; দেখুন ইন্দোচীন যুদ্ধ। তবে, ভিয়েতনাম দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। উত্তরে হো চি মিন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে একটি কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, এবং দক্ষিণে এনগো ডিন ডিয়েম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে একটি পুঁজিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এই আদর্শগত সংঘাতের ফলেই ১৯৫৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সূচনা হয়। এই যুদ্ধের অবসান ঘটে ১৯৭৫ সালে, যখন একটি উত্তর ভিয়েতনামী ট্যাংক সাইগনে দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশ করে এবং দেশটিকে কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে একীভূত করে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের অবসান ঘটে ১৯৮৪ সালে, যখন ব্রিটিশরা ব্রুনাইকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করে। পর্তুগালে একটি অভ্যুত্থানের পর পূর্ব তিমুর স্বাধীনতা ঘোষণা করলে ১৯৭৫ সালে ইন্দোনেশিয়া দেশটি দখল করে নেয়, এবং ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের এক গণভোটের পর তারা দেশটি ত্যাগ করে। এরপর পূর্ব তিমুর জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অধীনে ছিল এবং অবশেষে ২০০২ সালে দেশটি স্বাধীন হয়। ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরের সুনামি ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের কিছু অংশ (বিশেষ করে আচেহ, যেখানে উত্তাল জলে ১,০০,০০০-এরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল), থাইল্যান্ড, মায়ানমার এবং মালয়েশিয়ার জন্য সর্বনাশা ছিল।
১৯৯০-এর দশক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তুলনামূলকভাবে উচ্চ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামকে প্রায়শই "টাইগার শাবক অর্থনীতি" (Tiger Cub Economies) বলা হয়। এই নামটি মূল পূর্ব এশীয় রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর, হংকং, তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অনুকরণে রাখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও, বিশ্বের অন্যতম উর্বর এবং সম্পদ সমৃদ্ধ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও, ব্যাপক দুর্নীতির কারণে অনেক দেশেই দারিদ্র্য এখনও একটি বড় সমস্যা, যেখানে বেশিরভাগ সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু অভিজাত ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। একবিংশ শতাব্দীতে চীন এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমানভাবে একটি প্রধান শক্তি হয়ে উঠছে। চীন এখন বেশিরভাগ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের বৃহত্তম উৎস এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের পৃষ্ঠপোষকতায় অবকাঠামো খাতেও প্রচুর বিনিয়োগ করেছে।
সংস্কৃতি
[সম্পাদনা]
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংস্কৃতিতে প্রধানত ভারতীয় এবং চীনাদের প্রভাব দেখা যায়। এছাড়াও ঔপনিবেশিক শক্তি এবং মালয় দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীদেরও প্রভাব রয়েছে। কমপক্ষে ২০০০ বছর ধরে (এবং আজও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভারত ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যের একটি সংযোগ পথ হিসাবে কাজ করেছে। তবে, ঔপনিবেশিক যুগের আগমনের সাথেই ব্যাপক হারে অভিবাসন শুরু হয়েছিল। সিঙ্গাপুরে চীনারা জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। তবে এই অঞ্চলের সমস্ত দেশেই যথেষ্ট পরিমাণে চীনা, ভারতীয় এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু রয়েছে। তারা বিভিন্ন মাত্রায় স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে গেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক বড় ব্যবসার মালিক জাতিগত ভাবে চীনা। তাদের জনসংখ্যার তুলনায় তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি। জনসংখ্যার অন্যান্য অংশ দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে আসছে। তারা প্রায়শই বৈষম্যমূলক আইনের শিকার হয়। চরম ক্ষেত্রে, এমনকি জাতিগত সহিংসতারও শিকার হয়। তবে, এক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের মতো কিছু দেশ ইতিমধ্যে উক্ত অনেক বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করেছে।
থাই, বর্মী, কম্বোডীয় এবং লাও সংস্কৃতিতে ভারতীয় প্রভাব অনেক বেশি। বিশ্বাস, লোককথা, ভাষা এবং লেখার মতো ক্ষেত্রে এই প্রভাব দেখা যায়। তবে, তাদের রন্ধনশৈলীতে চীনা প্রভাবও প্রবল। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রুনাই ভারতীয়, মালয় এবং চীনাদের দ্বারা প্রভাবিত। বিশাল মুসলিম জনসংখ্যার কারণে এখানে আরব সংস্কৃতিরও ছোঁয়া রয়েছে। ভিয়েতনাম সবচেয়ে বেশি চীনা-প্রভাবিত। পূর্ব তিমুরের সংস্কৃতিতে পর্তুগিজ এবং মালয়দের প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সিঙ্গাপুরি এবং ফিলিপিনো সংস্কৃতি সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। সিঙ্গাপুরের সংস্কৃতি হল মালয়, ভারতীয়, পেরানাকান, ব্রিটিশ, আমেরিকান এবং চীনা সংস্কৃতির মিশ্রণ। অন্যদিকে ফিলিপাইনের উপর আমেরিকান, স্প্যানিশ, মালয়, চীনা, জাপানি এবং পর্তুগিজ প্রভাব প্রবল। ভারত, মেক্সিকো এবং ইউরোপের অ-আইবেরীয় অংশ থেকে প্রভাব কম এসেছে। সম্ভবত একারণেই এটি এই অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি পশ্চিমি ভাবাপন্ন দেশ।
যদিও একসময় এই অঞ্চলে হিন্দুধর্মের প্রাধান্য ছিল, আজকাল বেশিরভাগ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়রা ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম বা বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করে। তবে, হিন্দুধর্মের অবশেষ এখনও অনেক দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়দের লোককথা এবং সাংস্কৃতিক অনুশীলনে টিকে আছে, তাদের ধর্ম যাই হোক না কেন। এবং কিছু জাভানিজ মানুষ, যারা নামমাত্র মুসলিম, তারা কেজাভেন নামে একটি সমন্বিত ধর্ম পালন করে। এই ধর্মে মুসলিম, হিন্দু এবং সর্বপ্রাণবাদী বিশ্বাসের সংমিশ্রণ ঘটেছে।
ধর্ম
[সম্পাদনা]
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ধর্মীয়ভাবে বৈচিত্র্যময়। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রুনাই প্রধানত সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত, যেখানে পূর্ব তিমুর এবং ফিলিপাইন প্রধানত রোমান ক্যাথলিক অধ্যুষিত। থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামে বৌদ্ধধর্ম হল প্রধান ধর্ম, যেখানে ভিয়েতনামে মহাযান বৌদ্ধধর্ম এবং অন্যান্য দেশগুলিতে থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম প্রধান। কিছু পরিসংখ্যান অনুযায়ী সিঙ্গাপুর বিশ্বের সবচেয়ে ধর্মীয়ভাবে বৈচিত্র্যময় দেশ এবং এখানে কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম নেই, যদিও মহাযান বৌদ্ধধর্মাবলম্বীর সংখ্যা সর্বাধিক।
তবে, প্রতিটি দেশেই ধর্মীয় সংখ্যালঘু আছে। বিভিন্ন দেশে জাতিগত চীনা সংখ্যালঘু রয়েছে। তারা তাওবাদ এবং মহাযান বৌদ্ধধর্ম সহ বিভিন্ন ধর্মের মিশ্রণ চর্চা করে। ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশে এখনও হিন্দুধর্ম পালিত হয়। এর মধ্যে বালি দ্বীপ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ভিয়েতনামের চাম সম্প্রদায়ও হিন্দুধর্ম পালন করে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়াতে অনেক জাতিগত ভারতীয় বাস করে। তাদের একটি বড় অংশও হিন্দুধর্ম পালন করে। থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল এবং দক্ষিণ ফিলিপাইনের সুলু দ্বীপপুঞ্জে জাতিগত মালয়রা বাস করে। তাদের বেশিরভাগই ইসলাম ধর্ম পালন করে। ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপেও একটি বড় মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে। প্রতিটি দেশেই খ্রিস্টান সংখ্যালঘু আছে। ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া, পূর্ব নুসা তেঙ্গারা এবং উত্তর সুলাওয়েসিতে এদের সংখ্যা বেশি। পূর্ব মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকাতেও খ্রিস্টান সংখ্যালঘু দেখা যায়। সর্বপ্রাণবাদী উপজাতীয় ধর্মও প্রচলিত আছে। দুর্গম জঙ্গল বা পাহাড়ি এলাকার কিছু মানুষ এই ধর্ম পালন করে।
জলবায়ু
[সম্পাদনা]দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চল। এখানকার উষ্ণতা বছর প্রায় ৩০° সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকে। আর্দ্রতা বেশি থাকে এবং প্রায়ই বৃষ্টি হয়।

মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও দক্ষিণ থাইল্যান্ড সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরক্ষীয় অংশে মূলত দুটি বা তিনটি ঋতু রয়েছে — বর্ষা এবং শুষ্ক। এছাড়া বছরের বাকি সময় অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়। শুষ্ক ঋতুতে আবহাওয়া কিছুটা গরম (৩৫° সেলসিয়াস পর্যন্ত) এবং বর্ষা ঋতুতে কিছুটা শীতল (২৫° সেলসিয়াস পর্যন্ত) থাকে। বর্ষা ঋতু সাধারণত শীতে আসে। গরম ঋতু গ্রীষ্মকালে আসে। তবে, স্থানভেদে এর অনেক পরিবর্তন দেখা যায়।
ইন্দোচীনে (উত্তর/মধ্য থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ ভিয়েতনাম, মিয়ানমার) তিনটি ঋতু দেখা যায়। এগুলি হল গ্রীষ্ম, বর্ষা এবং শুষ্ক ঋতু। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুষ্ক ঋতু থাকে। এই সময় আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে ঠাণ্ডা থাকে। এই সময়টি পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এর পরে আসে তীব্র গরম ঋতু। এপ্রিলে তাপমাত্রা ৪০° সেলসিয়াসের উপরে চলে যেতে পারে। জুনের দিকে বৃষ্টি শুরু হলে আবহাওয়া ঠাণ্ডা হতে থাকে। তবে "বর্ষা" ঋতুতেও একটি সাধারণ ধরণ দেখা যায়। সকালবেলা রোদ থাকে। বিকেলে অল্প সময়ের জন্য মুষলধারে বৃষ্টি হয়। সারাদিন ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয় না। তাই শুধুমাত্র এই কারণে আপনার ভ্রমণ বাতিল করা উচিত নয়।
উত্তর ভিয়েতনামে চারটি আলাদা ঋতু আছে। এখানকার জলবায়ু হংকং এবং তাইওয়ানের মতো।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনেক পাহাড় আছে। উঁচু এলাকাগুলিতে আবহাওয়া সাধারণত ঠাণ্ডা থাকে। নিরক্ষীয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উঁচু এলাকাগুলিতে তাপমাত্রা সাধারণত ১৫-২৫° সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং মিয়ানমারের কিছু উঁচু পর্বতে প্রতি বছর বরফ পড়ে। ইন্দোনেশিয়া এবং মিয়ানমারে এমনকি স্থায়ী হিমবাহও রয়েছে।
মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশে (বিশেষ করে সুমাত্রা এবং বোর্নিও) এই ঘটনা দেখা যায়। ফিলিপাইনের কিছু অংশেও (বিশেষ করে পালাওয়ান) এটি হয়। মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শুষ্ক ঋতুতে ধোঁয়াশা একটি সাধারণ ঘটনা। এই ধোঁয়াশা দাবানল থেকে তৈরি হয়। এই আগুন সাধারণত ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়। চাষের জন্য জমি পরিষ্কার করতে এটি করা হয়। বাতাসের সাথে ধোঁয়াশা দ্রুত আসতে ও চলে যেতে পারে।
কথোপকথন
[সম্পাদনা]ভ্রমণকারীদের জন্য ইংরেজি সবচেয়ে দরকারি ভাষা। তবে সিঙ্গাপুর ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য কোনো দেশে বেশিদিন থাকতে হলে স্থানীয় ভাষা শেখা দরকার। শহরের বাইরে স্থানীয় ভাষা জানা অপরিহার্য হতে পারে।
প্রধান ভাষা গোষ্ঠীগুলি হল:
- অস্ট্রো-এশীয় - ভিয়েতনামী এবং খ্মের ভাষায অন্তর্ভুক্ত। ভিয়েতনামী ভাষা ভিয়েতনামে এবং খ্মের ভাষা কম্বোডিয়ায় ব্যবহৃত হয়। এই গোষ্ঠীতে মোন ভাষাও অন্তর্ভুক্ত। মায়ানমারের মোন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এই ভাষায় কথা বলে।
- অস্ট্রোনেশীয় - মালয়, ইন্দোনেশীয়, জাভানিজ, তাগালোগ, সেবুয়ানো, ইলোকানো, তেতুম এবং সম্পর্কিত ভাষায় কথা বলা হয়। এই ভাষাগুলি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, পূর্ব তিমুর এবং ব্রুনাইয়ের দ্বীপ রাষ্ট্রগুলিতে ব্যবহৃত হয়। সিঙ্গাপুরের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও এই ভাষায় কথা বলে। মালয় এবং ইন্দোনেশীয় ভাষা একে অপরের খুব কাছাকাছি। একটির বক্তারা সাধারণত অন্যটি বুঝতে পারে। এই গোষ্ঠীতে চাম ভাষাও রয়েছে। ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়ার চাম জাতিগোষ্ঠী এই ভাষায় কথা বলে।
- ক্রা-দাই (তাই-কাদাই) - থাই এবং লাও ভাষা অন্তর্ভুক্ত। থাই ভাষা থাইল্যান্ডে এবং লাও ভাষা লাওসে ব্যবহৃত হয়। উভয় ভাষা একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত পারস্পরিকভাবে বোধগম্য। এই গোষ্ঠীতে শান ভাষাও রয়েছে। মায়ানমারের শান জাতিগোষ্ঠী এই ভাষায় কথা বলে।
- চীন-তিব্বতি - বর্মী ভাষা তিব্বতি ভাষার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এটি চীনা ভাষা পরিবারের সাথে দূরবর্তীভাবে সম্পর্কিত। ম্যান্ডারিন সিঙ্গাপুরের একটি সরকারি ভাষা। মালয়েশিয়া, ব্রুনাই এবং মায়ানমারের জাতিগত চীনা সংখ্যালঘুরা এই ভাষায় ব্যাপকভাবে কথা বলে। সারা অঞ্চলের বড় চীনা সম্প্রদায়গুলি বিভিন্ন চীনা উপভাষায় কথা বলে। মায়ানমারের রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর রাখাইন ভাষা বর্মী ভাষার মতো। এটিকে প্রায়শই বর্মী ভাষার একটি উপভাষা হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
এখানে চীনা ভাষাগুলির একটি বড় প্রভাব রয়েছে। ম্যান্ডারিন সিঙ্গাপুরের একটি সরকারি ভাষা। সারা অঞ্চলের জাতিগত চীনা সম্প্রদায়গুলিতে দক্ষিণী উপভাষা ব্যবহার হয়। এর মধ্যে রয়েছে ক্যান্টোনিজ, হোক্কিয়েন, তেওচিউ, হাক্কা, ফুঝৌ উপভাষা এবং হাইনানিজ। অনেক স্থানীয় ভাষায় বিভিন্ন চীনা উপভাষা থেকে নেওয়া শব্দ রয়েছে। বিশেষ করে খাবারের ক্ষেত্রে এই শব্দগুলি বেশি দেখা যায়। এছাড়াও, বহু শতাব্দী ধরে চীনা সাংস্কৃতিক আধিপত্য ছিল। তাই ভিয়েতনামী শব্দভাণ্ডারের অনেক শব্দ চীনা ভাষা থেকে নেওয়া। চীনের ক্রমবর্ধমান পর্যটন শিল্পের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একটি প্রধান গন্তব্য। এর ফলে পর্যটকদের সুবিধার্থে ম্যান্ডারিন ভাষার প্রচলন বাড়ছে।
মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং মিয়ানমারের মতো প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিতে অনেক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ বাস করে। তারা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় কথা বলে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় তামিল ভাষা। তামিল সিঙ্গাপুরের অন্যতম সরকারি ভাষা। অন্যান্য ভারতীয় ভাষার মধ্যে আপনি মালয়ালম এবং পাঞ্জাবি শুনতে পারেন। এই অঞ্চলে ভারতীয় প্রভাবের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এর ফলে অনেক দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ভাষায় সংস্কৃত থেকে নেওয়া শব্দ আছে। এর মধ্যে রয়েছে মালয়, ইন্দোনেশীয়, থাই, লাও, বর্মী এবং খ্মের ভাষা। এছাড়াও, থাই, খ্মের, লাও এবং বর্মী ভাষা লেখার জন্য ভারতীয় লিপি ব্যবহার করা হয়। এই লিপিগুলি বেশিরভাগ ভারতীয় ভাষার লিপির সাথে সম্পর্কিত।
পর্তুগিজ ভাষা পূর্ব তিমুরের একটি সরকারি ভাষা। মালয়েশিয়ার কিছু সম্প্রদায়ে এখনও পর্তুগিজ-ভিত্তিক একটি ক্রেওল ভাষায় কথা বলে।
ইংরেজি সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীক ক্ষেত্র ও প্রশাসনের প্রধান ভাষা এবং ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের একটি সাধারণ দ্বিতীয় ভাষা। এই অঞ্চলের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা, যেমন বালি, ফুকেট এবং লুয়াং প্রাবাংেয় পর্যটন শিল্পে কর্মরত ব্যক্তিরা ব্যাপকভাবে ইংরেজি বলেন, যদিও তাদের দক্ষতার মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। যেসব ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সাথে কাজ করেন, তারা সাধারণত ভালো মানের ইংরেজি বলেন।
|
সিংলিশ
সিঙ্গাপুরের অনেক মানুষ এক ধরনের ইংরেজি ক্রিয়োল ভাষায় কথা বলেন, যেটাকে বলা হয় ‘সিংলিশ’। এতে আশেপাশের অনেক ভাষার শব্দ মিশে আছে এবং এর ব্যাকরণ ও উচ্চারণও একটু আলাদা। ইংরেজি মাতৃভাষী কারও কাছে প্রথমে এটি একেবারেই আলাদা ভাষার মতো শোনাতে পারে, তবে কিছুটা সময় দিলে বুঝতে সহজ হয়। তবে মনে রাখবেন, বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষ বিদেশিদের সাথে কথা বলার সময় নিজে থেকেই সাধারণ ইংরেজিতে কথা বলেন। |
ফরাসি ভাষা এখনও ভিয়েতনাম, লাওস এবং কম্বোডিয়ায় বলা ও শেখানো হয়। তবে দেশ ভেদে এর অবস্থা ভিন্ন। ভিয়েতনামে অনেক শিক্ষিত মানুষ ফরাসি জানেন। বিশেষ করে যারা ১৯৭৫ সালের আগে পড়াশোনা করেছেন। তবে আজকাল তরুণদের মধ্যে ইংরেজিই বেশি পছন্দের দ্বিতীয় ভাষা। লাওসে শিক্ষিত জনগণের মধ্যে ফরাসি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বেশিরভাগ সাইনবোর্ডেও ফরাসি ভাষা দেখা যায়। কম্বোডিয়ায় ফরাসি ভাষা মূলত শহরের বয়স্ক অভিজাত এবং অল্প কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
প্রাক্তন ঔপনিবেশিক দেশগুলির অন্যান্য ভাষাগুলি এখন আর ততটা বা একেবারেই বলা হয় না। আপনি মালয় ভাষায় ইংরেজি শব্দ, ইন্দোনেশীয় ভাষায় ওলন্দাজ শব্দ এবং তাগালোগ (ফিলিপাইন) ভাষায় স্প্যানিশ শব্দ দেখতে পাবেন।
প্রবেশ
[সম্পাদনা]বেশিরভাগ পশ্চিমা পর্যটকদের জন্য মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর এবং থাইল্যান্ড ভ্রমণের জন্য ভিসার প্রয়োজন হয় না। ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস এবং পূর্ব তিমুর বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশের নাগরিকদের জন্য আগমনের পর ভিসা (visa on arrival) প্রদান করে। বেশিরভাগ প্রবেশ পথেই এই সুবিধা পাওয়া যায়। ভিয়েতনাম এবং মিয়ানমার ভ্রমণের জন্য বেশিরভাগ পর্যটকদের আগে থেকে কাগজপত্র তৈরি করতে হয়। তবে, বেশিরভাগ পশ্চিমা পর্যটকরা ই-ভিসার জন্য যোগ্য। এর ফলে আপনাকে দূতাবাস বা কনস্যুলেটে যাওয়ার ঝামেলা পোহাতে হয় না।
আসিয়ান দেশগুলিতে (এই নিবন্ধে পূর্ব তিমুর ছাড়া সব দেশ) ভ্রমণকারীদের ভিসা সংক্রান্ত প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। আসিয়ান নাগরিকরা বেশিরভাগ আসিয়ান দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারে। চীনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলির সাথেও চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তিগুলি উভয় দিকের ভিসাকে প্রভাবিত করে। ভিসা ছাড়া ভ্রমণের মেয়াদ ভিসাযুক্ত ভ্রমণের চেয়ে কম হতে পারে। এটি মাত্র ১৪ দিন পর্যন্ত সীমিত হতে পারে। ইউরোপের শেঙেন চুক্তির মতো একটি সাধারণ আসিয়ান ভ্রমণ এলাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এটি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। আসিয়ান অঞ্চলের বাইরের পর্যটকদের অবশ্যই তারা যে দেশে যাচ্ছেন, সেই দেশের নির্দিষ্ট ভিসার নিয়মাবলী জেনে নিতে হবে। ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীরা দেশগুলির মধ্যে শুল্ক ছাড় এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সুবিধার সুযোগ নিতে পারেন। তবে, পর্যটকদের জন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার সময় সিগারেট, মদ, পারফিউম ইত্যাদির উপর সাধারণ শুল্কমুক্ত সীমা প্রযোজ্য হয়।
বিমানে
[সম্পাদনা]
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলি হল:
- ব্যাংকক সুবর্ণভূমি (BKK আইএটিএ) এই অঞ্চলের ব্যস্ততম বিমানবন্দর এবং ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার "প্রবেশদ্বার" হিসেবে কাজ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, এটিই একমাত্র গন্তব্য যেখানে অনেক দেশ থেকে নিয়মিত বিমান চলাচল করে। এটি পূর্ব এশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি বিমান গ্রহণকারী বিমানবন্দর। তবে, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ছাড়া ওশেনিয়ার অন্য কোনো দেশ থেকে এখানে সরাসরি বিমান আসে না।
- দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমান কেন্দ্র হল সিঙ্গাপুর চাঙ্গি বিমানবন্দর (SIN আইএটিএ)। এটি ওশেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার সাথে ভালোভাবে সংযুক্ত, তবে ব্যাংককের তুলনায় ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক কম বিমান আসে এবং পূর্ব ইউরোপ বা মধ্য এশিয়া থেকে কোনো বিমানই আসে না। এটি বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের সেরা বিমানবন্দরের স্থান পেয়েছে।
- কুয়ালালামপুর (KUL আইএটিএ), ম্যানিলা (MNL আইএটিএ), হো চি মিন সিটি (SGN আইএটিএ) এবং হ্যানয় (HAN আইএটিএ), ফুকেটের (HKT আইএটিএ) মতো বিমানবন্দরগুলি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব এশিয়ার সাথে ভালোভাবে সংযুক্ত। ম্যানিলা তার সুবিধাজনক ভৌগোলিক অবস্থান এবং সেখানে বসবাসকারী বিশাল ফিলিপিনো প্রবাসী জনসংখ্যার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভালোভাবে সংযুক্ত। ডেনপাসার বিমানবন্দরে (DPS আইএটিএ) অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড থেকে প্রচুর বিমান আসে। কারণ এটি বালির রৌদ্র ও সমুদ্র সৈকতের গন্তব্যগুলিতে পরিষেবা দেয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার ভ্রমণকারীরা প্রায়শই সুলভ মূল্যে বিমান টিকিট খুঁজে পান। তাইওয়ানের ইভা এয়ার, হংকংয়ের ক্যাথে প্যাসিফিক, জাপানের এএনএ এবং জাপান এয়ারলাইন্স, এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান এয়ার এই সুবিধা দেয়। এই বিমান সংস্থাগুলি তাদের নিজ নিজ হাবের মাধ্যমে সংযোগকারী বিমান চালায়। একইভাবে, ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং ইউরোপের ভ্রমণকারীরাও সুলভ মূল্যে টিকিট পেতে পারেন। তারা উপসাগরীয় তিনটি এয়ারলাইন্স - এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ এবং ইতিহাদ এয়ারওয়েজের মাধ্যমে এই সুবিধা পান।
হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও এই অঞ্চলে প্রবেশের জন্য একটি ভালো বিকল্প। অনেক স্বল্প খরচের বিমান সংস্থা এখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গন্তব্যগুলিতে বিমান চালায়।
সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স এবং থাই এয়ারওয়েজ তাদের চমৎকার পরিষেবা এবং সুরক্ষা রেকর্ডের জন্য পরিচিত। ফিলিপাইন এয়ারলাইন্স এই অঞ্চলের সবচেয়ে পুরানো এয়ারলাইন্স। এটি এখনও তার আসল নামে বিমান চালায়। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্স[অকার্যকর বহিঃসংযোগ] এবং গরুড় ইন্দোনেশিয়া ধীরে ধীরে তাদের আন্তঃমহাদেশীয় নেটওয়ার্ক বাড়াচ্ছে। দ্রুত সম্প্রসারিত এয়ারএশিয়া তার কুয়ালালামপুর হাব থেকে বিমান চালায়। এটি পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক বড় শহরে বিমান পরিষেবা প্রদান করে। এছাড়াও সিডনি, মেলবোর্ন, পার্থ এবং অকল্যান্ডের মতো দূরপাল্লার গন্তব্যেও বিমান চালায়। কুয়ালালামপুর হাবের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য শহরে সংযোগকারী বিমানও পাওয়া যায়। এয়ারএশিয়া জাকার্তা, ব্যাংকক এবং ম্যানিলায় কয়েকটি দ্বিতীয় স্তরের হাবও পরিচালনা করে। সিঙ্গাপুরেও তাদের একটি ভালো নেটওয়ার্ক রয়েছে। এয়ারএশিয়া ছাড়াও দূরপাল্লার স্বল্প খরচের বিমান বুক করা যায়। সিঙ্গাপুরে স্কুটের হাবে অথবা ম্যানিলায় সেবু প্যাসিফিকের হাবে এই বিমানগুলি আসে।
আসিয়ান দেশগুলির ভ্রমণকারীরা আসিয়ান একক বিমান চলাচল বাজার নীতির সুবিধা পেতে শুরু করেছে। এটি বাজার উন্মুক্ত করার একটি ধীর প্রক্রিয়া, যা ধীরে ধীরে হলেও বাস্তবায়িত হচ্ছে। এছাড়াও, ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সারা অঞ্চল জুড়ে অনেক বড় মাপের বিমানবন্দর নির্মাণ ও সম্প্রসারণ প্রকল্প চলছে।
ট্রেনে
[সম্পাদনা]চীনের নানিং থেকে ভিয়েতনামের হ্যানয় পর্যন্ত একটি রেলপথ রয়েছে। ভিয়েতনামের সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের এখনও কোনো রেল সংযোগ নেই। তবে কম্বোডিয়া এবং মিয়ানমার হয়ে একটি সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এই সংযোগটি বিদ্যমান থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হবে। চীনের কুনমিং থেকে লাওসের ভিয়েনতিয়েন পর্যন্ত একটি নতুন রেলপথ তৈরি হয়েছে। এটি ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সম্পন্ন হয়েছিল। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে প্রতিদিন উভয় দিকে একটি করে আন্তর্জাতিক ট্রেন চলাচল করছে। এই রেলপথটিকে ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর এবং সিঙ্গাপুর পর্যন্ত প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটি সম্পন্ন হতে এখনও অনেক দেরি। ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই এই ধরনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এতে নতুন গতি এবং পুঁজি এনেছে।
নৌকায়
[সম্পাদনা]বিশ্ব ভ্রমণের ক্রুজগুলির জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। এই ক্রুজগুলির অনেকগুলি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে থামে। সেখানে যাত্রীদের তীরে ভ্রমণের সুযোগ দেওয়া হয়। জনপ্রিয় বন্দরগুলির মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর, লংকাউই, পেনাং, তিওমান, রেডাং, ফুকেট, নিয়া চ্যাং, হা লং উপসাগর, হো চি মিন সিটি এবং কো সামুই।
ঘুরে দেখুন
[সম্পাদনা]সিঙ্গাপুর ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গণপরিবহন ব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তবে, এখানকার মানুষের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর অভ্যাস আছে। তাই দুর্বলচিত্তের মানুষদের জন্য এখানে গাড়ি চালানো ঠিক নয়। বেশিরভাগ সময়, যাতায়াতের জন্য বিমান, বাস বা ট্রেনই সবচেয়ে ভালো উপায়।
এখানে মোটরবাইক, ট্রাক, ভ্যান বা এমনকি সাইকেলকে পরিবর্তন করে যাত্রী পরিবহনের জন্য স্থানীয় যানবাহন তৈরি করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইনের জিপনি, ইউভি এক্সপ্রেস ও ট্রাইসাইকেল এবং থাইল্যান্ডে রয়েছে সংথ্যাও ও টুক-টুক। অন্যান্য জায়গাতেও একই ধরনের যানবাহন দেখা যায়। বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মোটরবাইকও ট্যাক্সি পরিষেবা দিয়ে থাকে। এই সমস্ত যানবাহন সাধারণত সস্তা ও বেশ রঙিন হয়, তবে কিছুটা অস্বস্তিকর এবং সম্ভবত বিপজ্জনকও হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হওয়ার সময় বিভিন্ন প্রতারণা থেকে সাবধান থাকুন। যদি কেউ আপনাকে পরবর্তী দেশের ভিসা পেতে সাহায্য করার প্রস্তাব দেয় বা "স্বাস্থ্য পরীক্ষার" জন্য কোনো দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন যে সেই ব্যক্তি আপনাকে প্রতারণা করার চেষ্টা করছে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মায়ানমার, কম্বোডিয়া এবং লাওসে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের দেশে প্রবেশ বা প্রস্থানের সময় স্ট্যাম্প দেওয়ার জন্য ঘুষ চাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বিমানবন্দরে সাধারণত এই সমস্যা হয় না, কিন্তু স্থল সীমান্তে প্রায়ই মাথাপিছু ১০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়। আন্তর্জাতিক রুটে বাস কোম্পানিগুলো প্রায়ই একটি "সীমান্ত পারাপার ফি" নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে, কোম্পানির কর্মীরা আপনার পাসপোর্ট নিয়ে সীমান্তে ইমিগ্রেশনের কাজ সম্পন্ন করে দেয় এবং সম্ভাব্য ঘুষের পরিমাণও এই ফির মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই ফি না দিলে আপনি সীমান্তে আটকে যেতে পারেন, কারণ তখন কর্মকর্তারা সরাসরি আপনার কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের চেষ্টা করবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ হল মালয়েশিয়ার গ্র্যাব এবং ইন্দোনেশিয়ার গোজেক। এখানে উবার এবং লিফটের কোনো পরিষেবা নেই।
বিমানে
[সম্পাদনা]দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ অংশেই এখন স্বল্প খরচের বিমান সংস্থাগুলির প্রাচুর্য ডদেখা যায়। এর মধ্যে বৃহত্তম হল মালয়েশিয়ার এয়ারএশিয়া এবং এর থাই, ইন্দোনেশীয়, ফিলিপিনো এবং কম্বোডীয় সহযোগী সংস্থাগুলি। এর ফলে যাতায়াতের জন্য এটি একটি দ্রুত এবং সাশ্রয়ী উপায়। ব্যাংকক, জাকার্তা, কুয়ালালামপুর এবং সিঙ্গাপুর হল এই অঞ্চলের স্বল্প খরচের বিমান সংস্থাগুলির প্রধান কেন্দ্র।
পূর্ণ-পরিষেবার বিমান সংস্থাগুলি প্রতিযোগিতার জন্য তাদের নিজস্ব স্বল্প খরচের বিমান সংস্থা চালু করেছে। এই নতুন সংস্থাগুলি এখন অনেক পর্যটন রুটে বিমান চালায়। এর উদাহরণ হল সিঙ্গাপুরের স্কুট, থাইল্যান্ডের নক এয়ার এবং মালয়েশিয়ার ফায়ারফ্লাই। এই বড় বহুজাতিক স্বল্প খরচের বিমান সংস্থা এবং বেশিরভাগ জাতীয় বিমান সংস্থাগুলি সম্মানজনক। কিন্তু কিছু ছোট বিমান সংস্থার সুরক্ষার রেকর্ড প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে পুরোনো বিমান ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ বিমানগুলিতে এই সমস্যা দেখা যায়। টিকিট কেনার আগে কিছু গবেষণা করে নিন।
প্রধান ব্যবসায়িক করিডোর জাকার্তা-সিঙ্গাপুর-কুয়ালালামপুর-ব্যাংকক বরাবর বিমান পরিষেবা খুব ঘন ঘন চলে। এর মানে হল এখানে প্রতিযোগিতা খুব বেশি। আপনি যদি আগে থেকে বুক করেন তবে দাম কম পাবেন।
ট্রেনে
[সম্পাদনা]এই অঞ্চলের বেশিরভাগ জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ট্রেনকে সাধারণত বাসের চেয়ে নিরাপদ বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে রাতের যাত্রার জন্য। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ট্রেনে ভ্রমণ করতে বাসের চেয়ে বেশি সময় লাগে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ রেলপথ ঔপনিবেশিক যুগের নিদর্শন। এর মানে হল এগুলি বেশিরভাগই একক লাইনের এবং ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করে। তাই দেরি হওয়াটা সাধারণ ঘটনা এবং গতিও বেশ কম।
থাইল্যান্ডের রেল নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বিস্তৃত। এখানকার পরিষেবা তুলনামূলকভাবে ঘন ঘন এবং সাশ্রয়ী। যদিও বেশিরভাগ বাসের তুলনায় ধীর, পরিষেবা সাধারণত নির্ভরযোগ্য। ব্যাংকক থেকে প্রধান লাইনগুলি বিভিন্ন দিকে গেছে। উত্তরে চিয়াং মাই পর্যন্ত লাইন রয়েছে। উত্তর-পূর্বের লাইনটি নাখোন রাতচাসিমা (খোরাত) হয়ে নং খাই (এবং ভিয়েনতিয়েনের নতুন খামসাভাত স্টেশন) ও উবোন রাতচাথানি পর্যন্ত বিস্তৃত। পূর্বদিকের লাইন ছাচোয়েংসাও হয়ে অরন্যপ্রথেত পর্যন্ত এবং দক্ষিণ-পূর্বের লাইনটি পাতায়া হয়ে সাত্তাহিপ পর্যন্ত যায়। আর দক্ষিণের দীর্ঘতম লাইনটি সুরাত থানি (প্রদেশ) হয়ে কো সামুই, কো ফা নান, কো তাও ও হাত ইয়াই এবং তারপর মালয়েশিয়ার মধ্য দিয়ে বাটারওয়ার্থ, কুয়ালালামপুর ও জোহর বাহরু হয়ে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত পৌঁছেছে।
ভিয়েতনামে একটি লাইন রয়েছে যা দেশটিকে উত্তর থেকে দক্ষিণে সংযুক্ত করে। কিন্তু এখানেও ট্রেনের গতি বেশ কম।
ইন্দোনেশিয়া এবং মিয়ানমারের নেটওয়ার্ক আরও সীমিত এবং জরাজীর্ণ। এগুলিতে ভ্রমণ মূলত পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণের জন্য সেরা। ফিলিপাইনের লুজন দ্বীপে একটি সীমিত রেল নেটওয়ার্ক রয়েছে। এটি একসময় অবহেলায় পড়ে ছিল। তবে বিদেশি সহায়তায় এটিকে ধীরে ধীরে পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। কম্বোডিয়ার রেলপথ গৃহযুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ২০১০-এর দশকে তা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে নমপেন থেকে দুটি লাইন দুই দিকে গেছে; একটি গেছে সমুদ্রতীরবর্তী শহর সিহানুকভিল পর্যন্ত এবং অন্যটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বাটামবাং পর্যন্ত।
মালয়েশিয়া এবং লাওসের রেলপথ তুলনামূলকভাবে দ্রুত, আধুনিক, আরামদায়ক এবং বৈদ্যুতিক। কুনমিং-ভিয়েনতিয়েন রেলপথে ট্রেনগুলি লাওস অংশে ঘণ্টায় ১৬০ কিমি পর্যন্ত গতিতে চলে। এই ট্রেন বোটেনে চীন থেকে লাওসে সীমান্ত পার করে। তারপর লুয়াং প্রাবাং এবং ভাং ভিয়েং হয়ে ভিয়েনতিয়েন পর্যন্ত যায়। মালয়েশিয়ায়, কেটিএমের ইটিএস পরিষেবা চলে। এটি উপদ্বীপীয় মালয়েশিয়ার পশ্চিম উপকূল বরাবর চলে। এই পরিষেবা সেগামাত থেকে থাই সীমান্তের পাদাং বেসার পর্যন্ত যায়। পাদাং বেসারে আপনি থাই ট্রেনে বদলি করতে পারেন। এই পথে কুয়ালালামপুর এবং ইপোহ শহর পড়ে। বাটারওয়ার্থ পর্যন্ত একটি শাখা লাইনও রয়েছে। সেখান থেকে জর্জ টাউন যাওয়ার জন্য ফেরি পাওয়া যায়। এই লাইনের ট্রেনগুলি ঘণ্টায় ১৪০ কিমি সর্বোচ্চ গতিতে পৌঁছাতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একমাত্র উচ্চ-গতির রেল লাইনটি ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে রয়েছে। এটি জাকার্তা-বান্দুং লাইন। ভবিষ্যতে এই লাইনটি পূর্ব জাভার সুরাবায়া পর্যন্ত প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। থাইল্যান্ডে একটি উচ্চ-গতির রেললাইন তৈরি হচ্ছে। এটি ব্যাংকক থেকে লাওস সীমান্তের নং খাই পর্যন্ত যাবে। তবে এটি সম্পন্ন হতে এখনও কয়েক বছর বাকি।
মিয়ানমারের রেলপথ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় যেমন ছিল, এখনও তেমনই দেখায়। ধীর, অস্বস্তিকর এবং বিলম্বপ্রবণ রেল নেটওয়ার্কের চেয়ে বাস এবং বিমান ভ্রমণ অনেক বেশি পছন্দের।
বাসে
[সম্পাদনা]দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাস একটি সস্তা এবং জনপ্রিয় পরিবহন ব্যবস্থা। বাস সাধারণত ট্রেনের চেয়ে দ্রুত চলে। যেসব দেশে রেল নেটওয়ার্ক সীমিত বা নেই, সেখানে বাসগুলি আরও বেশি শহরে পরিষেবা দেয়। তবে স্থানীয়দের গাড়ি চালানোর অভ্যাস এবং রাস্তার অবস্থার কারণে বাস কম নিরাপদ।
বাসের শ্রেণী এবং ধরন দেশ ভেদে ভিন্ন হয়। তবে বেশিরভাগ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশে বিলাসবহুল বা প্রথম শ্রেণীর বাস চলে। এই বাসগুলি প্রধান শহরগুলির মধ্যে দূরপাল্লার রুটে চলাচল করে। দরিদ্র অঞ্চলে মিনিবাস বা বাতানুকুল ছাড়া বাস বেশি দেখা যায়। স্থানীয় বাসগুলি সাধারণত শুধুমাত্র বড় শহরগুলিতেই পাওয়া যায়। আন্তঃসীমান্ত বাস পরিষেবাও পাওয়া যায়।
নৌকায়
[সম্পাদনা]
আন্তর্জাতিক ফেরি সংযোগ আশ্চর্যজনকভাবে সীমিত। তবে মালয়েশিয়া থেকে সুমাত্রা (ইন্দোনেশিয়া) যাওয়া সম্ভব। সিঙ্গাপুর থেকে রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জ (ইন্দোনেশিয়া) এবং জোহর (মালয়েশিয়া) যাওয়া যায়। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের মধ্যে বিভিন্ন ক্রুজও চলাচল করে। মাঝে মাঝে এই ক্রুজগুলি কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এমনকি হংকং পর্যন্ত যায়।
অভ্যন্তরীণ যাত্রী ফেরিগুলি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপকে সংযুক্ত করে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনে এটি দেখা যায়। কিন্তু সুরক্ষা বিধি প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়। নৌকাগুলিতে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা হয় এবং নৌকাডুবি অস্বাভাবিক নয়। নৌকায় ওঠার আগে সেটি ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিন। যেসব নৌকাতে অতিরিক্ত ভিড় বা যেগুলো খুব পুরোনো মনে হয়, সেগুলি এড়িয়ে চলুন।
গাড়িতে
[সম্পাদনা]গাড়িতে করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে ভ্রমণ করা সম্ভব। এছাড়াও এখানকার বিভিন্ন দ্বীপের মধ্যেও গাড়িতে ভ্রমণ করা যায়। কিন্তু এটি অবশ্যই দুর্বলচিত্তের মানুষদের জন্য নয়। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ব্রুনাইয়ে আপনি নিজে গাড়ি চালাতে পারেন। রাস্তায় সৌজন্যের অভাবের সাথে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। এরপর বড় কোনো সমস্যা ছাড়াই গাড়ি চালানো যায়। তবে অন্যান্য জায়গায় ট্রাফিকের অবস্থা খারাপ থেকে শুরু করে চরম বিশৃঙ্খল পর্যন্ত হতে পারে। তাই চালকসহ গাড়ি ভাড়া করার পরামর্শ দেওয়া হয়। নিজে গাড়ি চালানোর চেষ্টা না করাই ভালো।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ব্রুনাই, পূর্ব তিমুর এবং সিঙ্গাপুরে রাস্তার বাম দিক দিয়ে গাড়ি চলে। অন্যান্য সব জায়গায় গাড়ি ডান দিক দিয়ে চলে।
দর্শনীয় স্থান
[সম্পাদনা]ভূদৃশ্য ও প্রকৃতি
[সম্পাদনা]- আরও দেখুন: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্যপ্রাণী

সক্রিয় আগ্নেয়গিরি থেকে দর্শনীয় উপকূলরেখা, বিশুদ্ধ অতিবৃষ্টি অরণ্য থেকে নিরক্ষীয় হিমবাহ, এবং চিত্তাকর্ষক ধানের ক্ষেত থেকে বিশাল নদী ব্যবস্থা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই সবই আছে। এই অঞ্চলে চৌদ্দটি প্রাকৃতিক ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে। আরও কয়েক ডজন পরীক্ষামূলক তালিকায় রয়েছে। এছাড়াও শত শত জাতীয় উদ্যান এবং অন্যান্য সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকা আছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশেই চিত্তাকর্ষক পর্বতমালা রয়েছে। এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ পর্বতগুলি (৫,০০০ মিটারের বেশি) উত্তর মিয়ানমারে হিমালয়ের পূর্ব প্রান্তে পাওয়া যায়। তবে ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া প্রদেশের লরেঞ্জ জাতীয় উদ্যানের পর্বতগুলিও প্রায় সমান উঁচু। এই পর্বতগুলি তাদের নিরক্ষীয় হিমবাহের জন্য পরিচিত। আরেকটি উঁচু পর্বত হল বোর্নিওর মালয়েশীয় অংশে অবস্থিত মাউন্ট কিনাবালু (প্রায় ৪,১০০ মিটার)। এখানে পৌঁছানো সহজ হওয়ায় এটি আরোহণের জন্য জনপ্রিয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরের রিং অফ ফায়ারে অবস্থিত। তাই এখানে প্রচুর সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। এগুলি প্রধানত ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনে দেখা যায়। ফিলিপাইনের সর্বোচ্চ আগ্নেয়গিরি হল মাউন্ট আপো। ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জে ১০০টিরও বেশি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় হল মাউন্ট মেরাপি (২০২০ সালেও এখানে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে)। আর সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হল মাউন্ট ব্রোমো।

গ্রীষ্মমন্ডলীয় বর্ষাবন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ ভূখণ্ডে দেখা যায়। মূল ভূখণ্ডের মৌসুমি বন থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের দ্বীপগুলির নিরক্ষীয় চিরহরিৎ বর্ষাবন পর্যন্ত এটি বিস্তৃত। মূল ভূখণ্ডের কয়েকটি প্রধান বর্ষাবন জাতীয় উদ্যান রয়েছে। এর মধ্যে আছে থাইল্যান্ডের খাও সক ও খাও ইয়াই এবং মালয়েশিয়ার তামান নেগারা। সুমাত্রা এবং বোর্নিওর বর্ষাবন ওরাঙ্গুটানের আবাসস্থল হিসাবে পরিচিত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক বর্ষাবন এবং অন্যান্য ভূখণ্ডে বিপন্ন প্রাণী প্রজাতি বাস করে। এর মধ্যে কিছু প্রাণী গুরুতরভাবে বিপন্ন। যেমন ভিয়েতনামের কুক ফুওং এলাকায় বিভিন্ন প্রাইমেট প্রজাতি রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার উজং কুলোন নিম্নভূমির বর্ষাবনে জাভার গণ্ডার পাওয়া যায়। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় ইন্দোচীন বাঘ দেখা যায়। এর মধ্যে থুংইয়াই-হুয়াই খা খায়েং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইন্দোনেশিয়ার কোমোডো জাতীয় উদ্যান হল বিশ্বের বৃহত্তম টিকটিকি, কোমোডো ড্রাগনের আবাসস্থল।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান নদী হল মেকং, যাকে প্রায়শই ইন্দোচীন অঞ্চলের জীবনরেখা বলা হয়। এটি চীন থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে প্রবাহিত হওয়ার পথে মায়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনাম (মেকং বদ্বীপ)—এই পাঁচটি দেশের মধ্যে দিয়ে গেছে। কম্বোডিয়ায় মেকং নদী তোনলে সাপ হ্রদের মতো এক অনন্য পরিবেশগত ঘটনা সৃষ্টি করে এবং ক্রাতি শহরের আশেপাশে এই নদীতে ডলফিনও দেখতে পাওয়া যায়। এই অঞ্চলের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী হল সালউইন, যা মূলত মায়ানমারের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফিলিপাইনের পুয়ের্তো প্রিন্সেসার ভূগর্ভস্থ নদীটিও বেশ আকর্ষণীয়; ৮ কিমি দীর্ঘ এই নদীটি সম্ভবত বিশ্বের দীর্ঘতম ভূগর্ভস্থ নদী। তোনলে সাপ ছাড়াও এই অঞ্চলে আরও কিছু বড় হ্রদ রয়েছে, যেমন মায়ানমারের ঘনবসতিপূর্ণ ইনলে হ্রদ এবং ইন্দোনেশিয়ার টোবা হ্রদ, যা আসলে একটি বিশাল আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় নদী ও হ্রদকে কেন্দ্র করে ভাসমান বাজার বা গ্রাম গড়ে উঠেছে। এর বিখ্যাত উদাহরণগুলির মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়ার সিম রিপের চারপাশের ভাসমান গ্রাম এবং থাইল্যান্ডের দামনোয়েন সাদুয়াক ও ইন্দোনেশিয়ার বানজারমাসিনের ভাসমান বাজার।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রচুর আকর্ষণীয় ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং ভূদৃশ্য রয়েছে। এর প্রধান উদাহরণ হল লাওসের ভাং ভিয়েংের কার্স্ট। অন্যান্য উদাহরণের মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইনের বোহোলের চকোলেট পাহাড় এবং ভিয়েতনামের ফোং না-কে বাংের গুহা। আকর্ষণীয় উপকূলীয় এবং সামুদ্রিক ভূদৃশ্যের মধ্যে রয়েছে থাইল্যান্ডের আও ফাং নার চুনাপাথরের শিলা গঠন। এছাড়াও ভিয়েতনামের হা লং উপসাগর এবং ইন্দোনেশিয়ার রাজা আম্পাতের সামুদ্রিক কার্স্টও উল্লেখযোগ্য। দর্শনীয় সৈকত এবং জলের নিচের জীবন (ডাইভিং এবং স্নরকেলিংয়ের জন্য) সম্পর্কে আরও তথ্য নিচের করুন বিভাগে পাওয়া যাবে।

প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক কৃষি ভূদৃশ্যও অত্যন্ত দর্শনীয়। এই অঞ্চলের প্রধান ফসল হল ধান, এবং বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ধান উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে পাঁচটিই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার। যেসব অঞ্চল তাদের মনোরম ধানের ক্ষেতের জন্য পরিচিত, তার মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইনের কর্ডিলেরা অঞ্চল, ভিয়েতনামের সা পা সংলগ্ন এলাকা এবং ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ। বালির সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য, যার মধ্যে ৯ম শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সুবাক সেচ ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত, বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য সাধারণ ফসলের মধ্যে রয়েছে কফি, চা, রাবার, চিনি, তামাক এবং বিভিন্ন ধরণের গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফল। বিস্তীর্ণ চা বাগানের জন্য বিখ্যাত অঞ্চলগুলির মধ্যে মালয়েশিয়ার ক্যামেরন উচ্চভুূমি এবং ইন্দোনেশিয়ার পুঞ্চাক পার্বত্য গিরিপথ এলাকা অন্যতম।
জাদুঘর
[সম্পাদনা]দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব বড় শহরেই বিভিন্ন ধরনের জাদুঘর রয়েছে। রাজধানী শহরগুলির জাদুঘরগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত সংস্কৃতি ও ইতিহাস জাদুঘর রয়েছে সিঙ্গাপুরে। এর মধ্যে আছে জাতীয় জাদুঘর (অরচার্ডে) এবং এশীয় সভ্যতা জাদুঘর (রিভারসাইডে)। অন্যান্য বেশিরভাগ রাজধানীতেও জাতীয় জাদুঘর রয়েছে। এগুলিতে দেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের উপর আলোকপাত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকক (রত্নকোসিন), জাকার্তা (সেন্ট্রাল), নমপেন, হ্যানয়, ম্যানিলা (এর্মিটা), এবং কুয়ালালামপুর (ব্রিকফিল্ডস)। ব্রিকফিল্ডসে মালয়েশিয়ার ইসলামিক শিল্পকলা জাদুঘরও রয়েছে। এখানে এই অঞ্চলের ইসলামিক শিল্পের বৃহত্তম সংগ্রহ দেখা যায়। ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়েও বেশ কয়েকটি চমৎকার সংস্কৃতি ও ইতিহাস জাদুঘর আছে। যেমন চারুকলা জাদুঘর এবং ভিয়েতনাম জাতিবিদ্যা জাদুঘর। ঐতিহাসিক মালাক্কা শহরে বাবা ও ননিয়া ঐতিহ্য জাদুঘর অবস্থিত। এখানে পেরানাকানদের সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে। পেরানাকানরা হল ১৫শ শতাব্দীর চীনা অভিবাসীদের বংশধর, যারা স্থানীয় মালয় নারীদের বিয়ে করেছিল।

সারা অঞ্চল জুড়ে আঞ্চলিক এবং স্থানীয় ইতিহাসের নির্দিষ্ট ঘটনাগুলিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য জাদুঘর রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হো চি মিন সিটির যুদ্ধাপরাধ জাদুঘর, যা ভিয়েতনাম যুদ্ধের উপর ভিত্তি করে তৈরি। নমপেনের তুওল স্লেং গণহত্যা জাদুঘরটি কম্বোডীয় গণহত্যার উপর ভিত্তি করে তৈরি। ইন্দোনেশিয়ার বান্দা আচেহতে রয়েছে আচেহ সুনামি জাদুঘর। এটি ২০০৪ সালের বক্সিং ডে সুনামির উপর ভিত্তি করে তৈরি, যেটিতে প্রায় ২,৫০,০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল (যাদের অর্ধেকেরও বেশি আচেহর বাসিন্দা ছিলেন)। ডিলিতে রয়েছে প্রতিরোধ জাদুঘর, যা তিমুরের স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে তৈরি।
আধুনিক শিল্পের সংগ্রহের জন্য সিঙ্গাপুর একটি অন্যতম প্রধান স্থান। উদাহরণস্বরূপ, রিভারসাইড জেলার জাতীয় গ্যালারি। বালির উবুদ শহরও আধুনিক শিল্পের জন্য পরিচিত, যেখানে কয়েক ডজন আর্ট গ্যালারি এবং জাদুঘর রয়েছে।
সারা অঞ্চলে প্রচুর উদ্ভিদ উদ্যান রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত ও সুপরিচিত হল সিঙ্গাপুরের উত্তর ও পশ্চিম জেলার বোটানিক গার্ডেন। এছাড়াও থাইল্যান্ডের পাতায়ার কাছে নং নুচ গ্রীষ্মমন্ডলীয় উদ্যান এবং ইন্দোনেশিয়ার বোগোরের উদ্ভিদ উদ্যানও বিখ্যাত।
প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও প্রাক-ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য
[সম্পাদনা]দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রচুর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। এখানে ১০ লক্ষ বছরেরও বেশি পুরানো আদিম মানুষের প্রাগৈতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। আবার ৮ম থেকে ১৪শ শতাব্দীর মহান হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দিরও রয়েছে। এই বিভাগে প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের ঐতিহাসিক স্থানগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য নিয়ে পরবর্তী বিভাগে আলোচনা করা হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিনটি প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার সোলোর কাছে তথাকথিত সাঙ্গিরান আদিম মানব ক্ষেত্রটি পাওয়া যায়। এখানে আদিম মানুষের জীবাশ্ম রয়েছে (যা 'জাভা মানবের' সাথে সম্পর্কিত)। এই জীবাশ্মগুলির বয়স আনুমানিক ৭,০০,০০০ থেকে ১০,০০,০০০ বছর বলে মনে করা হয়। এগুলি সম্ভবত আরও পুরানো হতে পারে। মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যে লেংগং উপত্যকা রয়েছে। এখানে চারটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান আছে যেখানে বিভিন্ন যুগের সরঞ্জাম, অস্ত্র, গয়না এবং অন্যান্য জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। এছাড়াও এখানে 'পেরাক মানবের' কঙ্কাল পাওয়া গেছে। থাইল্যান্ডের উদন থানির কাছে বান চিয়াং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। এখানে লাল রঙের মাটির পাত্র পাওয়া যায়। এগুলির বয়স ২,০০০ থেকে ৪,০০০ বছর।

বর্তমানে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হিন্দুধর্ম মূলত কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ, ভিয়েতনামের চাম সম্প্রদায় এবং মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের ভারতীয় সম্প্রদায়। অন্যদিকে, বৌদ্ধধর্ম ইন্দোচীন, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার এবং সারা অঞ্চলের প্রবাসী চীনা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে, প্রায় ৪র্থ থেকে ১৫শ শতাব্দী পর্যন্ত হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম পালন করা হতো। অনেক সময় উভয় ধর্মের সমন্বিত রূপও পালন করা হতো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এগুলি অনুসরণ করত। এর ফলে সারা অঞ্চলে অনেক হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দির নির্মিত হয়েছিল। দুটি বিশ্ব-বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত। এগুলি হল ইন্দোনেশিয়ার বোরোবুদুর (৮ম-৯ম শতাব্দী) এবং কম্বোডিয়ার আংকর ওয়াট (১২শ শতাব্দী)। আংকর ওয়াট আংশিকভাবে একটি হিন্দু মন্দির চত্বরও বটে। প্রধান হিন্দু মন্দিরগুলির মধ্যে রয়েছে ভিয়েতনামের মাই সন (৪র্থ-১৪শ শতাব্দী)। এছাড়াও আছে ইন্দোনেশিয়ার প্রাম্বানান (৯ম শতাব্দী; বোরোবুদুর মন্দিরের কাছে)। কম্বোডিয়ার প্রিয়া ভিহিয়ার মন্দির (১১শ-১২শ শতাব্দী) এবং লাওসের ভাত ফু (১১শ-১৩শ শতাব্দী) ও উল্লেখযোগ্য। এই সমস্ত মন্দিরই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে গণ্য।
প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের অন্যান্য প্রধান ঐতিহাসিক স্থানও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে থাইল্যান্ডের সুখোথাই ঐতিহাসিক উদ্যান। এটি সুখোথাই রাজ্যের (১৩শ-১৫শ শতাব্দী) রাজধানী ছিল। মধ্য মিয়ানমারের পিউ প্রাচীন শহরগুলিও (খ্রিস্টপূর্ব ২য় থেকে ১১শ শতাব্দী) উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও আছে ভিয়েতনামের প্রাচীন শহর ও বাণিজ্য বন্দর হোই আন (১৫শ থেকে ১৯শ শতাব্দী)। মধ্য থাইল্যান্ডের প্রাচীন রাজধানী আউত্তাইয়াও (১৪শ শতাব্দী) একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মিয়ানমারে বাগান এবং ম্রাউক ইউর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। এগুলি যথাক্রমে বামার এবং রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর প্রাচীন রাজ্যের মহান রাজধানী ছিল। প্রতিটি স্থানে আক্ষরিক অর্থেই হাজার হাজার প্রাচীন মন্দির রয়েছে। মান্দালয় শহরের কাছে ইনওয়া অবস্থিত। ব্রিটিশদের বিজয়ের আগে এটি বর্মী রাজ্যের অন্যতম শেষ রাজধানী ছিল। ভিয়েতনামে দুটি বিখ্যাত পুরানো দুর্গ পাওয়া যায়। একটি হল ১১শ শতাব্দীর হ্যানয় দুর্গ। অন্যটি হল মধ্য উপকূল অঞ্চলের হো রাজবংশের ১৪শ শতাব্দীর দুর্গ। মধ্য উপকূলে হিউ শহরটিও অবস্থিত। এটি ছিল নগুয়েন রাজবংশের শেষ রাজধানী। এই রাজবংশ ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ফরাসি আধিপত্যের অধীনে নামমাত্র শাসন করেছিল।
ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য
[সম্পাদনা]
থাইল্যান্ড ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব দেশই ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। তারা ১৬শ থেকে ২০শ শতাব্দীর মধ্যে বিভিন্ন সময় ধরে শাসিত হয়েছিল। এর ফলে, এই অঞ্চলে দুর্গ, অবকাঠামো এবং ভবন সহ যথেষ্ট ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য রয়েছে। স্বাধীন থাকা সত্ত্বেও, থাইল্যান্ডও ইউরোপীয় প্রভাব এড়াতে পারেনি। সেখানেও বেশ কিছু চিত্তাকর্ষক ইউরোপীয় শৈলীর ভবন রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক শহর হল মালাক্কা। এটি ছিল মালাক্কা সালতানাতের রাজধানী। পরবর্তীতে এটি পর্তুগিজ, ডাচ এবং ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। মালাক্কার কিছু প্রধান আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে পর্তুগিজ দুর্গ এ ফামোসা (১৫১১) এবং সেন্ট পল গির্জা (১৫২১)। এছাড়াও আছে ওলন্দাজস্ট্যাডথুইস (সিটি হল, ১৬৫০)। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্য বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে মধ্য কুয়ালালামপুর (যেমন ১৯শ শতাব্দীর শেষে নির্মিত সরকারি অফিস`), ইপোহ এবং সিঙ্গাপুরের রিভারসাইড এলাকা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় সমাবেশ সম্ভবত জর্জ টাউন এবং ইয়াঙ্গুনে দেখা যায়।
১৬১৯ সাল থেকে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা পর্যন্ত, ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের রাজধানী ছিল বাটাভিয়া (বর্তমান জাকার্তা)। তাই এই শহরে প্রচুর ঔপনিবেশিক ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে পশ্চিম জাকার্তার বাটাভিয়া সিটি হল (নির্মিত ১৭০৭-১৭১০, এখন জাকার্তা ইতিহাস জাদুঘর)। এছাড়াও আছে মধ্য জাকার্তার নব্য-গথিক জাকার্তা ক্যাথেড্রাল (নির্মিত ১৮৯১-১৯০১)। ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জের বাকি অংশেও ঔপনিবেশিক যুগের নিদর্শন রয়েছে। কার্যত প্রতিটি শহর ও নগরেই এগুলি দেখা যায়। যেমন মাকাস্সারে ১৭শ শতাব্দীর ফোর্ট রটারড্যাম। যোগজাকার্তায় ১৮শ শতাব্দীর ফোর্ট ভ্রেদেবুর্গ। এবং বান্দুংেয় ২০শ শতাব্দীর প্রথম দিকের অনেক আর্ট ডেকো স্থাপত্য। ১৯শ শতাব্দীর প্রথম দিকে জাভা জুড়ে গ্রেট পোস্ট রোড নির্মিত হয়েছিল। এর ফলে পুরো দ্বীপের দ্রুত বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্ভব হয়েছিল।

স্প্যানিশ শাসনামলে ফিলিপাইনে প্রচুর ক্যাথলিক গির্জা নির্মিত হয়েছিল। এর মধ্যে চারটি বারোক গির্জা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় রয়েছে। যেমন ম্যানিলার ঐতিহাসিক কেন্দ্রে অবস্থিত সান অগাস্টিন গির্জা এবং ইলোইলোর মিয়াগাও গির্জা। ঐতিহাসিক ভিগান শহরটি একটি হিস্পানিক শহর। এটি তার পাথরের রাস্তা এবং ইউরোপীয়-প্রাচ্য মিশ্র স্থাপত্যের জন্য সুপরিচিত। ফিলিপাইন আমেরিকান শাসনের অধীনে আসার পর, অনেক আর্ট ডেকো শৈলীর সরকারি ভবন নির্মিত হয়েছিল।
প্রাক্তন ফরাসি ইন্দোচীন জুড়ে ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্য পাওয়া যায়। লাওসের প্রাক্তন রাজধানী লুয়াং প্রাবাং বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় রয়েছে। এটি ঔপনিবেশিক এবং প্রাক-ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের সুসংরক্ষিত মিশ্রণের জন্য বিখ্যাত। একইভাবে, ভিয়েতনামের হ্যানয় এবং হোই আনের পুরানো শহরগুলিতে ফরাসি ঔপনিবেশিক শৈলীর অনেক ভবন রয়েছে। এর বৃহত্তম শহর হো চি মিন সিটিতেও বেশ কিছু চিত্তাকর্ষক ফরাসি ঔপনিবেশিক ভবন আছে। যেমন সাইগন কেন্দ্রীয় ডাকঘর, নগর ভবন এবং সাইগন অপেরা হাউস।
অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
[সম্পাদনা]
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দশ লক্ষেরও বেশি জনসংখ্যার কয়েক ডজন শহর রয়েছে, এবং এগুলির মধ্যে অনেক শহরের নগরদৃশ্য খুবই চিত্তাকর্ষক। এই অঞ্চলের প্রধান আধুনিক শহর হল সিঙ্গাপুর, যার মেরিনা বে এলাকার দিগন্তরেখা বিশেষভাবে পরিচিত। অন্যান্য প্রধান শহরগুলিতেও, বিশেষ করে জাকার্তা, কুয়ালালামপুর, ম্যানিলা, ব্যাংকক এবং হো চি মিন সিটিতে প্রচুর আকাশচুম্বী ভবন ও অফিস টাওয়ার রয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়া একটি পরিকল্পিত শহর, যেখানে আধুনিকতা এবং ঐতিহ্যের এক পরাবাস্তব মিশ্রণ দেখা যায়।
ব্রুনাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র দেশ যা একটি সালতানাত। এখানকার সুলতানের আবাসিক প্রাসাদ, ইস্তানা নুরুল ইমান-কে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাসাদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে, এটি সাধারণত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। ব্যতিক্রম শুধু হরি রায়া আইদিলফিত্রির (ঈদুল ফিতর) দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ দিন, যখন সুলতান একটি 'উন্মুক্ত গৃহ' আয়োজন করেন, জনসাধারণের পুরুষ সদস্যদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং বিনামূল্যে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। ইতিহাস জুড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অংশে অসংখ্য সালতানাত রাজত্ব করেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল মাতারাম সালতানাত (যার উত্তরসূরি হল সোলো এবং যোগজাকার্তার বর্তমান সালতানাত) এবং মালাক্কা সালতানাত। সারা অঞ্চল জুড়ে, বিশেষ করে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায়, সুলতানদের প্রাসাদ এবং সম্পর্কিত জাদুঘর দেখতে পাওয়া যায়।
মালয়েশিয়া, ব্রুনাই এবং ইন্দোনেশিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় এই অঞ্চলে অনেক মসজিদ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য মসজিদগুলির মধ্যে রয়েছে মধ্য জাকার্তার ইস্তিকলাল মসজিদ। এটি এই অঞ্চলের বৃহত্তম মসজিদ, যার ধারণক্ষমতা ২,০০,০০০। এছাড়াও শাহ আলমের নীল মসজিদ এবং বন্দর সেরি বেগাওয়ানের ওমর আলি সাইফুদ্দিন মসজিদ বিখ্যাত।
ওপরে উল্লিখিত জাদুঘরগুলি ছাড়াও এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশেই যুদ্ধ-সম্পর্কিত দর্শনীয় স্থান পাওয়া যায়। কম্বোডিয়ায়, নমপেনের কাছে চোয়েউং একের বধ্যভূমি কম্বোডীয় গণহত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। ভিয়েতনামে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত অনেক স্থান রয়েছে। যেমন উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রাক্তন সীমান্তের চারপাশে অসামরিক অঞ্চল। এছাড়াও কু চি সুড়ঙ্গ ব্যবস্থাও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ইন্দোনেশিয়ায় স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত অসংখ্য স্থান রয়েছে। যেমন মধ্য জাকার্তার মোনাস জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ।
যাদের সামরিক ইতিহাসে আগ্রহ আছে, তারা প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধ এবং ইন্দোচীন যুদ্ধের অনেক ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেতে পারেন।
ভ্রমণপথ
[সম্পাদনা]করুন
[সম্পাদনা]জলক্রীড়া
[সম্পাদনা]
- স্কুবা ডাইভিং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটকদের জন্য একটি প্রধান আকর্ষণ, কারণ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ডে বিশ্বমানের ডাইভিং স্থান রয়েছে।
- সার্ফিংও একটি জনপ্রিয় খেলা হয়ে উঠছে, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া (যেখানে নিয়াস এবং বালি প্রধান আকর্ষণ) এবং ফিলিপাইনে।
- নৌচালনা বা সেইলিংও বেশ জনপ্রিয়, বিশেষত দক্ষিণ থাইল্যান্ডে।
- ফিলিপাইনের কামারিনেস সুরে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম ওয়েক বোর্ডিং কেন্দ্রে ওয়েক বোর্ডিং করার চেষ্টা করতে পারেন।
- ফিলিপাইনের পালাওয়ানে অবস্থিত পুয়ের্তো প্রিন্সেসা ভূগর্ভস্থ নদী জাতীয় উদ্যানে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ নদী ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।
ম্যাসাজ
[সম্পাদনা]দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ড, তার ঐতিহ্যবাহী ম্যাসাজের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। যদিও ম্যাসাজ পার্লারগুলির অবস্থা বিভিন্ন রকম হয়, পর্যটন এলাকার বড় হোটেলগুলির পার্লার সাধারণত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, তবে তার জন্য আপনাকে সাধারণত অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়। তা সত্ত্বেও, এখানকার দাম বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশের তুলনায় অনেক কম; এখানে ১-ঘণ্টার ম্যাসাজ প্রায় ৫-২০ মার্কিন ডলারে শুরু হয়।
খেলাধুলা
[সম্পাদনা]- দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় গেমস - এটি সংক্ষেপে সি গেমস (SEA Games) নামে পরিচিত। এটি প্রতি দুই বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশের মধ্যে বিজোড় বছরে এই আয়োজন করা হয়। এর গঠন অলিম্পিকের মতো, যদিও এটি অনেক ছোট আকারের হয়। এখানে এমন কিছু খেলাও রয়েছে যা শুধুমাত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জনপ্রিয়। যেমন সেপাক টাকরো (এটি মূলত ভলিবলের মতো, তবে হাত দিয়ে না খেলে পা দিয়ে খেলা হয়; এটি তার দর্শনীয় মাথার ওপর পা দিয়ে শট করার জন্য পরিচিত) এবং সিলাত (একটি মালয় মার্শাল আর্ট)। শেষ সংস্করণ ২০২৩ সালে কম্বোডিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তী সংস্করণ ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হবে।
- ফুটবল (সকার) — ফিলিপাইন ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা (ফিলিপাইনে বাস্কেটবল বেশি জনপ্রিয়)। যদিও খেলার মান ইউরোপ বা এশিয়ার অন্যান্য অংশের মতো নয়, তবুও ফুটবল প্রতিযোগিতা দেখা স্থানীয় সংস্কৃতিকে অনুভব করার একটি চমৎকার উপায়। ফুটবল সংস্কৃতি অনুভব করার জন্য থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেরা দেশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত ঘরোয়া লীগ এবং এশীয় মানের সম্মানজনক জাতীয় দল রয়েছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ম্যাচে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয় এবং প্রচুর দর্শক সমাগম হয়।
কেনাকাটা
[সম্পাদনা]পূর্ব তিমুর ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিটি দেশের নিজস্ব মুদ্রা রয়েছে। মার্কিন ডলার হল পূর্ব তিমুরের সরকারি মুদ্রা। এটি কম্বোডিয়া এবং লাওসের বেসরকারি মুদ্রা। বড় অঙ্কের লেনদেনের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু শহরে এটি ব্যাপকভাবে চলে। প্রধান শহরগুলিতে ইউরোও ব্যাপকভাবে চলে। তবে ডলারের মতো ভালো বিনিময় হার খুব কমই পাওয়া যায়। থাই বাত কম্বোডিয়া, লাওস এবং মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চলে। সিঙ্গাপুরকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান আর্থিক কেন্দ্র হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাই সমস্যায় পড়লে প্রধান পর্যটন এলাকাগুলিতে সিঙ্গাপুর ডলার সাধারণত গ্রহণ করা হয়। এটি ব্রুনাইয়ে বৈধ মুদ্রা। তবে বিনিময় হার খুব একটা ভালো নাও হতে পারে। এই অঞ্চলের বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় মুদ্রাগুলির বিনিময় হার খুব খারাপ থাকে। তাই পৌঁছানোর পরেই মুদ্রা বিনিময় করা (বা এটিএম ব্যবহার করা) সবচেয়ে ভালো। বিকল্পভাবে, সিঙ্গাপুর এবং হংকংেয় অনেক মুদ্রা বিনিময়কারী রয়েছে। তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় মুদ্রাগুলির জন্য ভালো বিনিময় হার দেয়। তাই আপনি মুদ্রা বিনিময়ের জন্য ট্রানজিটে এক বা দুই রাত কাটানোর পরিকল্পনা করতে পারেন।
মার্কিন ডলার নিয়ে আসার সময় নিশ্চিত করুন যে আপনার নোটগুলি একেবারে নতুন অবস্থায় আছে। সিঙ্গাপুরের বাইরে, মার্কিন ডলারের নোটে সামান্য ভাঁজ থাকলেও বেশিরভাগ দোকান এবং মুদ্রা বিনিময়কারী তা প্রত্যাখ্যান করবে। এমনকি যারা এটি গ্রহণ করবে, তারাও অনেক খারাপ বিনিময় হার দেবে।
খরচ
[সম্পাদনা]সিঙ্গাপুর ছাড়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সবচেয়ে সাশ্রয়ী অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি। এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশে একজন ব্যাকপ্যাকারের জন্য প্রতিদিন ২০ মার্কিন ডলারের বাজেটই যথেষ্ট। অন্যদিকে, একজন বুদ্ধিমান ভ্রমণকারী প্রতিদিন ১০০ মার্কিন ডলারে ভালো খেতে, পান করতে এবং বিলাসবহুল হোটেলে থাকতে পারেন।
কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। ধনী নগর-রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর এবং ব্রুনাই তাদের প্রতিবেশীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ব্যয়বহুল। অন্যদিকে, মিয়ানমার, পূর্ব তিমুর এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মতো অনুন্নত জায়গাগুলিতে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে সেখানেও খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরে জমির স্বল্পতার কারণে থাকার খরচ অনেক বেশি। সেখানে একটি চার-তারা হোটেলের জন্য আপনাকে প্রতি রাতে ২০০ মার্কিন ডলারের বেশি খরচ করতে হতে পারে। এছাড়াও, এই অঞ্চলের অনেক দেশ বিজ্ঞাপনে থাকা ভাড়ার সাথে কর এবং পরিষেবা মুল্য উল্লেখ করে না। তাই আপনার আসল ঘরের ভাড়া সার্চ ইঞ্জিনে দেখা ভাড়ার চেয়ে ২০% পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
কেনাকাটা
[সম্পাদনা]দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কেনাকাটার জন্য একটি স্বর্গ। এখানে দামি ব্র্যান্ডের জিনিসপত্র এবং রাস্তার খুব সস্তা জিনিস, দুটোই পাওয়া যায়। বিশেষ করে ব্যাংকক এবং কুয়ালালামপুরে প্রচুর বিলাসবহুল শপিং মল রয়েছে। এগুলিতে দামি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জিনিস পাওয়া যায়। এই মলগুলি জীবনযাত্রার কেন্দ্র হিসাবেও কাজ করে। এদের চিত্তাকর্ষক স্থাপত্যের কারণে কিছু না কিনলেও এগুলি ঘুরে দেখার মতো। অন্যদিকে, রাস্তার বাজারগুলি এখনও দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ (সিঙ্গাপুর ছাড়া)। খুব সস্তা বা নকল জিনিস কেনার জন্য এগুলিই সেরা জায়গা। থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই এবং ইন্দোনেশিয়ার বালির উবুদের মতো কিছু শহর ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম বিক্রির বিশাল বাজারের জন্য পরিচিত। এখানে প্রায়শই স্থানীয় শিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি জিনিস কেনা যায়। এছাড়াও পোশাক, গয়না, আসবাবপত্র ইত্যাদি অর্ডার দিয়ে তৈরি করিয়ে নেওয়া সম্ভব।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাক এবং অন্যান্য জিনিসপত্র সাধারণত উন্নত দেশগুলির মতোই দামি। এমনকি কখনও কখনও আরও বেশি দামি হয়। যেসব ব্র্যান্ডের জিনিসপত্র তুলনামূলকভাবে সস্তা মনে হয় (যেমন ইন্দোনেশিয়ায় পোলো রালফ লরেন শার্ট), সেগুলি সাধারণত নকল হয়। এমনকি যখন এগুলি রাস্তায় বিক্রি না হয়ে কোনো বৈধ দোকান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মলে বিক্রি হয়, তখনও এগুলি নকল হতে পারে। রাস্তার সস্তা জিনিস এবং ব্র্যান্ডের জিনিসের মানের মধ্যে যদি আপোস করতে চান, তবে দেশীয় ব্র্যান্ডের দোকান খুঁজতে পারেন। যেমন মালয়েশিয়ার এফ.ও.এস বা ফিলিপাইনের বেঞ্চ (Bench)।
একটু বেশি দামি উপহারের জন্য, মালয়েশিয়ার রয়্যাল সেলাঙ্গর দেখতে পারেন। এটি পিউটার (দস্তার সংকর) পণ্যের বিশ্বের প্রধান প্রস্তুতকারক।
দর কষাকষি
[সম্পাদনা]যেসব জায়গায় দাম নির্দিষ্ট করা থাকে না, যেমন সাধারণ বাজার বা পুরোনো জিনিসের বাজারে, সেখানে দর কষাকষি করুন। দাম বলার সময় যদি আপনি বিক্রেতাকে হাসাতে পারেন বা তার সাথে হেসে কথা বলেন, তাহলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিক্রেতারা আপনাকে সহজেই ছাড় দেবে। যদি তারা রাজি না হয়, তাহলে হেসে বিদায় জানানোর ভান করুন; হতে পারে বিক্রেতা তার মন পরিবর্তন করে আপনাকে ছাড় দিয়ে দিল। ঘড়ি, সানগ্লাস বা জুতোর মতো সাধারণ জিনিসপত্র কেনার সময় মনে রাখবেন যে এগুলির দাম প্রায়শই অনেক বাড়িয়ে বলা হয়। আপনার যদি দর কষাকষির দক্ষতা থাকে, তবে চাওয়া দামের প্রায় ২০% দামে এগুলি কেনা সম্ভব। আপনি যদি দাম কমিয়ে একটি যুক্তিসঙ্গত মূল্যে আনতে না পারেন, তাহলে বুঝতে হবে আপনার পদ্ধতিতে কোথাও ভুল হচ্ছে। আরও পরামর্শের জন্য দর কষাকষি দেখুন।
সাধারণ নিয়ম হল, যদি কোনো জিনিসের দাম স্পষ্টভাবে লেখা না থাকে, তাহলে আপনাকে দর কষাকষি করতে হবে। তবে, অনেক সময় লেখা দামের উপরেও দর কষাকষি করা যায়।
আহার
[সম্পাদনা]

- আরও দেখুন: থাই রন্ধনশৈলী, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাইয়ের রন্ধনশৈলী, ফিলিপিনো রন্ধনশৈলী, ভিয়েতনামী রন্ধনশৈলী, ইন্দোনেশীয় রন্ধনশৈলী, কম্বোডীয় রন্ধনশৈলী
দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় খাবার দেশগুলির বৈচিত্র্যময় ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে। এটিকে মোটামুটিভাবে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হল মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস এবং মিয়ানমার)। অন্যটি হল সামুদ্রিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, পূর্ব তিমুর)। এমনকি এর পরেও এলাকাভেদে খাবারের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক জায়গায় চীনা এবং ভারতীয় প্রভাব দেখা যায়। স্থানীয় উপকরণ, কৌশল এবং স্বাদের সাথে এই প্রভাবগুলি মিশে গেছে। ফিলিপাইনের খাদ্য সংস্কৃতি সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। কারণ তাদের উপর স্পেন এবং আমেরিকার অতিরিক্ত প্রভাব রয়েছে।
রাস্তার বিক্রেতা বা হকাররা এই অঞ্চলের খাদ্য সংস্কৃতির একটি মূল ভিত্তি। তারা খুব কম দামে চমৎকার সব খাবার পরিবেশন করে। আপনি যদি স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে খুব সতর্ক থাকেন, তাহলে আগুনে ঝলসানো, ডুবো তেলে ভাজা বা খুব ভালোভাবে সেদ্ধ করা খাবার বেছে নিতে পারেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে থাই এবং ভিয়েতনামি খাবার, যেমন বহুল প্রচলিত প্যাড থাই (থাই নুডলস) এবং গরুর মাংসের ফো (নুডলস স্যুপ), বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এর পরেই মালয়েশীয় রেস্তোরাঁর স্থান। কিন্তু একটি সাধারণ কথা প্রায়ই শোনা যায় যে, রাস্তার পাশে পরিবেশন করা তাজা খাবারের সাথে এগুলোর কোনো তুলনাই হয় না। রাস্তার খাবারের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য সিঙ্গাপুর সম্ভবত সবচেয়ে সহজ জায়গা। যদিও ব্যাংকক এবং পেনাংেয় আরও ভালো হকার পাওয়া যায়, এবং হো চি মিন সিটিও খুব বেশি পিছিয়ে নেই।
ভাত হল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান খাদ্য। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসাবে বিভিন্ন ধরণের নুডলস খাওয়া হয়। সকালের নাস্তায় স্যুপসহ নুডলস বা কঞ্জি (ভাতের জাউ) খাওয়াটা সাধারণ। মালয়েশিয়ায় রোটি চানাই, যা সিঙ্গাপুরে রোটি প্রাটা নামে পরিচিত, দক্ষিণ ভারতীয় পরোটার উপর ভিত্তি করে তৈরি। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং লাওসে ফরাসি প্রভাবিত বাগেত রুটির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ দেখা যায়। এটি তাদের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ফল। এর সেরা উদাহরণ হল বান মি (ভিয়েতনামী স্যান্ডউইচ), যদিও এটি তৈরিতে প্রায়শই গম এবং চালের আটার মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।
ঝাল মরিচের প্রতি ভালোবাসা এই অঞ্চলের সর্বত্র দেখা যায়। এর অনেক বিখ্যাত খাবারে মরিচ ব্যবহার হয়। কখনও মূল উপাদান হিসাবে, কখনও বা আলাদা গার্নিশ হিসাবে এটি ব্যবহার করা হয়। যেমন থাই কারি এবং তম ইয়াম স্যুপ থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়ার গরুর মাংসের রেনদাং। এছাড়াও মালয়েশিয়ার আসাম লাকসা থেকে কম্বোডিয়ার আমোকেও মরিচ ব্যবহার হয়। অনভিজ্ঞ ভোজনরসিকরা ঝালের জ্বালা মেটাতে গ্লাসের পর গ্লাস জল পান করতে পারেন। কিন্তু স্থানীয়দের পরামর্শ হল এর পরিবর্তে গরম চা পান করা। রান্নার সময় ঝাল কমাতে বলা সবসময় কাজ করে না। প্রায়শই কম ঝাল দেওয়া খাবার খাওয়ার সময়ও আপনার চোখে জল আসতে পারে, যখন পাশের স্থানীয়রা আনন্দের সাথে তাদের খাবার খায়। মরিচ হল দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রান্নায় ব্যবহৃত অনেক মশলার মধ্যে একটি মাত্র। খাবারে তীব্র সুগন্ধ আনতে লেমনগ্রাস, তেঁতুল এবং লবঙ্গের মতো মশলা জনপ্রিয়।
সমুদ্র এবং নদীর পাশে বসবাস করার কারণে, সামুদ্রিক খাবার এখানকার মানুষের খুব পছন্দের। মাছ এবং চিংড়ি খাবারে প্রধান স্থান পায়। গাঁজানো মাছের সস এবং চিংড়ির পেস্ট প্রায়শই দৈনন্দিন রান্নায় ব্যবহৃত হয়। তবে, সিঙ্গাপুরের চিলি ক্র্যাবের মতো শেলফিশ অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এটি সাধারণত বিশেষ অনুষ্ঠানে বা ধনী ব্যক্তিরা উপভোগ করেন।
গ্রীষ্মমন্ডলীয় আবহাওয়ার কারণে এখানে সারা বছরই বিভিন্ন আকার ও আকৃতির সুস্বাদু ফল পাওয়া যায়। ভ্রমণকারীদের মধ্যে আম একটি অন্যতম প্রিয় ফল। দৈত্যাকার কাঁটাযুক্ত ডুরিয়ান সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে একমাত্র সাধারণ বিষয়। এটি তার তীব্র গন্ধের জন্য কুখ্যাত। অনেকে এর স্বাদকে খোলা নর্দমার পাশে বসে রসুনের আইসক্রিম খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। অন্যান্য স্বতন্ত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ফল হল বেগুনি রঙের ম্যাঙ্গোস্টিন, লোমশ র্যাম্বুটান এবং কাঁঠালের মতো চেম্পেডাক। এদের বাইরের আবরণের নিচে রসালো মাংসল অংশ থাকে। ভালো স্বাদ এবং দামের জন্য কোন ফলের কী মরসুম, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
উন্নতমানের খাবারের সুযোগ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও উন্নত দেশগুলিতে বাড়ছে। ব্যাংকককে সাধারণত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেরা ফাইন ডাইনিংয়ে শহর হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সিঙ্গাপুরও খুব বেশি পিছিয়ে নেই এবং হো চি মিন সিটি দ্রুত এগিয়ে আসছে। যদিও অন্যান্য জায়গাতেও ভালো বিকল্প পাওয়া যায়। সিঙ্গাপুর ছাড়া, উন্নতমানের খাবার সাধারণ মধ্যবিত্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়দের নাগালের বাইরে। তা সত্ত্বেও, পশ্চিমা দেশ এবং পূর্ব এশিয়ার একই মানের খাবারের তুলনায় এখানকার দাম অনেক বেশি সাশ্রয়ী।
ইয়েলপের মতো পশ্চিমা রেস্তোরাঁর পর্যালোচনার ওয়েবসাইটগুলি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির জন্য সাধারণত নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ স্থানীয়রা সেখানে খুব কমই পর্যালোচনা পোস্ট করে। এর পরিবর্তে, স্থানীয় পর্যালোচনার ওয়েবসাইট রয়েছে যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে। যেমন ইতিগো, ওপেনরাইস এবং জোম্যাটো। কিছু দেশের নিজস্ব অ্যাপ রয়েছে যা সেই দেশগুলির মধ্যে সাধারণত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। তবে একটি স্পষ্ট অসুবিধা হল যে প্রায় সমস্ত পর্যালোচনা শুধুমাত্র স্থানীয় ভাষায় থাকে। এর উদাহরণ হল থাইল্যান্ডের ওংনাই এবং ভিয়েতনামের ফুডি।
পানীয়
[সম্পাদনা]চাল-ভিত্তিক মদ — যেমন থাই হুইস্কি, তুবা, লাও, তুয়াক, আরক ইত্যাদি — সর্বত্র পাওয়া যায়। এগুলি বেশ কড়া হয়, যদিও স্বাদে খুব একটা ভালো নয়। কিছু এলাকায়, বিশেষ করে ফিলিপাইনে, রামও প্রচলিত। এটি স্থানীয় আখ থেকে তৈরি করা হয়। সাধারণত, স্থানীয় মদ সস্তা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ দেশ আমদানি করা মদের উপর খুব বেশি কর আরোপ করে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিয়ার অবশ্যই চেখে দেখার মতো। এগুলি প্রায়শই খুব সস্তা হয়। সান মিগেল (ফিলিপাইন), সিংহা, চ্যাং বিয়ার (থাইল্যান্ড), বির বিনতাং, আংকর বিয়ার (ইন্দোনেশিয়া), টাইগার বিয়ার (সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া) চেখে দেখতে পারেন। এছাড়াও আছে সাইগন বিয়ার, হ্যানয় বিয়ার, হুদা বিয়ার, ৩৩৩ বিয়ার, বিয়া হোই (ভিয়েতনাম), বিয়ারলাও (লাওস), আংকর এবং আংকর স্টাউট (কম্বোডিয়া)। লাগার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় শৈলী। যদিও স্টাউট (বিশেষ করে গিনেস)ও জনপ্রিয়। বড় শহরগুলিতে প্রচুর ছোট মদ তৈরির কারখানা এবং আমদানি করা বিয়ার পাওয়া যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থানীয়রা মূলত মাতাল হওয়ার জন্যই বিয়ার পান করে, স্বাদের জন্য নয়। তাই, পশ্চিমা মান অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বেশিরভাগ বিয়ার পশ্চিমা নিম্নমানের বিয়ারের সমতুল্য। বিয়ারে বরফ মেশানোর স্থানীয় অভ্যাস দেখে অবাক হবেন না। এটি শুধু বিয়ারকে ঠাণ্ডা রাখে না, বরং এর কড়া অ্যালকোহলের পরিমাণও (সাধারণত ৬%) কমিয়ে দেয়।
অতিরিক্ত কর এবং মূলত অনুপযুক্ত জলবায়ুর কারণে, ওয়াইন এখানে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। যদিও আপনি মধ্য ও উত্তর থাইল্যান্ড, বালি এবং ভিয়েতনামে কয়েকটি ওয়াইন তৈরির কারখানা খুঁজে পেতে পারেন। কোনো রেস্তোরাঁ থেকে ওয়াইন কিনবেন না, যদি না আপনি নিশ্চিত হন যে এটি সঠিকভাবে রাখা হয়েছে। কারণ গ্রীষ্মমন্ডলীয় গরমে একটি বোতল রেখে দিলে কয়েক মাসের মধ্যে এটি ভিনেগারে পরিণত হবে। ব্যতিক্রম হল প্রাক্তন ফরাসি উপনিবেশ লাওস এবং কম্বোডিয়া। এদের বড় শহর ভিয়েনতিয়েন এবং নমপেনে ভালো মানের ওয়াইনের সংগ্রহ পাওয়া যায়।
কাছাকাছি অবস্থিত অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলে প্রচুর ওয়াইন রপ্তানি করে। এটি মূলত উচ্চমানের হোটেল বা রেস্তোরাঁগুলিতে পাওয়া যাবে। যদিও বাজেট/ব্যাকপ্যাকার পর্যটকদের জন্য তৈরি জায়গাগুলিতেও কিছু পাওয়া যেতে পারে। সস্তা স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলিতে সাধারণত কোনো ওয়াইন থাকে না।
ফলের রস এবং নারকেলের জল সর্বত্র পাওয়া যায়। বিশেষ করে মুসলিম এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি জনপ্রিয়, যেখানে মদ পানের প্রথা নেই।
সারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক শৈলীর চা এবং কফি পাওয়া যায়। ভিয়েতনামী কফি এবং থাই চা এর কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের তেহ তারিকও (টেনে তৈরি করা চা) বিখ্যাত। অস্ট্রেলীয় চকোলেট মল্ট পানীয় মাইলো সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ায়ও জনপ্রিয়।
নিরাপদ থাকুন
[সম্পাদনা]
সাধারণভাবে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পর্যটকদের জন্য পথঘাট পুরোপুরি নিরাপদ। তবে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ডের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিম্ন-স্তরের বিদ্রোহ চলছে। মিয়ানমারে ২০২১ সাল থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে, তাই সেখানে ভ্রমণ করার পরামর্শ দেওয়া হয় না।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সহিংস অপরাধ বিরল। তবে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন কিন্তু বহুল প্রচারিত ঘটনায় সমুদ্র সৈকতের রিসর্টে পর্যটকরা আক্রান্ত হয়েছেন।
সুযোগসন্ধানী চুরি বেশি সাধারণ। তাই ভিড়ের জায়গায় পকেটমারদের থেকে সাবধান থাকুন। ভ্রমণের সময়, বিশেষ করে রাতের বাস ও ট্রেনে, আপনার ব্যাগের উপর সতর্ক নজর রাখুন। কিছু এলাকায় ছিনতাইও সাধারণ ঘটনা। তাই রাস্তার যান চলাচলের বিপরীত দিকে হাঁটুন। এবং আপনার ব্যাগটি রাস্তা থেকে দূরের দিকে বহন করুন। পর্যটন এলাকা পরিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হওয়ার সময় সাধারণ প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকুন।
এখানকার প্রধান বিপদ হল খুব দুর্বল সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এছাড়াও হোয়াইট ওয়াটার রাফটিং এবং বাঞ্জি জাম্পিংয়ের মতো শারীরিক কার্যকলাপের উপর খুব কম বা কোনো তদারকি নেই।
২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরের সুনামিতে আনুমানিক ২,৩০,০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। থাইল্যান্ডের পশ্চিম উপকূল এবং ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অনেক বিদেশী পর্যটক আহত বা নিহত হয়েছিলেন। এর ফলে পরবর্তী বছরগুলিতে সুনামি থেকে সরে যাওয়ার এলাকা এবং সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে উন্নত করা হয়েছে।
যদিও এই অঞ্চলে প্রচুর মাদকদ্রব্য উৎপাদিত, বিতরণ এবং সেবন করা হয়, বেশিরভাগ দেশেই কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ায় অল্প পরিমাণে মাদক রাখলেও কঠোর শাস্তি হয়। এবং মাদক পাচারের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিদেশী নাগরিকত্ব বা ঘুষ কোনোটিই পর্যটকদের কঠোর শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে না।
প্রতি বছর, কয়েক ডজন বিদেশী পর্যটক (এবং আরও অনেক স্থানীয়) মিথানল বিষক্রিয়ায় মারা যান। স্থানীয়ভাবে বাড়িতে তৈরি মদ পান করার ফলে এটি ঘটে। এটি যেকোনো দেশেই ঘটতে পারে। তবে লাওস, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডে বিদেশী পর্যটকদের সাথে এটি সবচেয়ে বেশি ঘটে। ভুল চোলাই পদ্ধতির কারণে অসাবধানবশত বিষাক্ত মিথানল তৈরি হয়। মিথানল বিষক্রিয়া এড়াতে, শুধুমাত্র একটি সিল করা বোতল থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত করা মদ পান করুন। যদি আপনি কারও বাড়িতে যান এবং আপনাকে বাড়িতে তৈরি মদ দেওয়া হয়, তাহলে বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করুন।
সুস্থ থাকুন
[সম্পাদনা]সিঙ্গাপুর এবং থাইল্যান্ড বিশ্বের প্রধান দুটি চিকিৎসা পর্যটন কেন্দ্র। সিঙ্গাপুরে, সরকারি এবং বেসরকারি উভয় হাসপাতালেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উচ্চমানের। তবে, দামও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি (যদিও বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশের চেয়ে সস্তা)। থাইল্যান্ডে চিকিৎসার খরচ সিঙ্গাপুর এবং পশ্চিমা দেশগুলির তুলনায় অনেক কম। তাই স্বল্প বাজেটের মানুষদের জন্য এটি একটি জনপ্রিয় চিকিৎসা পর্যটন গন্তব্য। বেসরকারি হাসপাতালগুলি সাধারণত আন্তর্জাতিক মান মেনে চলে। ব্যাংককের কিছু বেসরকারি হাসপাতালকে বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে, সরকারি হাসপাতালগুলির অবস্থা প্রায়শই তেমন ভালো হয় না।
মালয়েশিয়া এবং ব্রুনাইয়ে সরকারি ও বেসরকারি উভয় হাসপাতালেই সাধারণত উচ্চমান বজায় রাখা হয়। ফিলিপাইনে ম্যানিলার সরকারি ও বেসরকারি উভয় হাসপাতালেই চিকিৎসার মান সমানভাবে ভালো। তবে গ্রামীণ এলাকা এবং ছোট শহরগুলিতে অবস্থা প্রায়শই খারাপ থাকে। ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি হাসপাতালগুলি অবশ্যই পশ্চিমা মান থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। তবে প্রধান শহরগুলিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে। এগুলি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরিচালিত হয়। মিয়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া এবং পূর্ব তিমুরে স্বাস্থ্যসেবার মান সাধারণত খারাপ। তাই যেকোনো বড় চিকিৎসার জন্য আপনি সম্ভবত থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে যেতে চাইবেন। আপনার বীমা যেন এর খরচ বহন করে, তা নিশ্চিত করুন।
জয়েন্ট কমিশন ইন্টারন্যাশনাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানের উপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিকভাবে হাসপাতালগুলিকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও এই হাসপাতালগুলির জন্য আপনাকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হবে, তবে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে আপনি পশ্চিমা মানের যত্ন এবং চিকিৎসা পাবেন।
সম্মান প্রদর্শন
[সম্পাদনা]আপনাকে প্রায়শই জুতো খুলতে বলা হতে পারে, বিশেষ করে মন্দির, মসজিদ বা অতিথিশালায় প্রবেশ করার সময়। এমন জুতো পরুন যা সহজে খোলা ও পরা যায়, বিশেষ করে যদি আপনার অনেক মন্দির পরিদর্শনের পরিকল্পনা থাকে, এবং খেয়াল রাখবেন আপনার মোজা যেন ছেঁড়া না থাকে। বৌদ্ধ মন্দিরগুলিতে, আপনাকে খালি পায়ে কোথায় যেতে হবে তা দেশ ভেদে ভিন্ন হয়; মিয়ানমারে, পুরো মন্দির চত্বরে প্রবেশের আগেই আপনাকে জুতো খুলতে হবে, যেখানে থাইল্যান্ডে, শুধুমাত্র ঠাকুরঘরে প্রবেশের আগে জুতো খুলতে হয়।
{{#assessment:অঞ্চল|ব্যবহারযোগ্য}}

